সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩

মার্কিন-ইরান সংঘাত: হরমোজ প্রণালী ও যুদ্ধের নতুন মাত্রা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম

মার্কিন-ইরান সংঘাত: হরমোজ প্রণালী ও যুদ্ধের নতুন মাত্রা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ফের নতুন করে অস্থিরতার কালো মেঘ জমা হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পর দুই দেশ ফের প্রত্যক্ষ সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এই নতুন উত্তজনা কেবল সামরিক বা কৌশলগত নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ হরমোজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে এক নতুন সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে। রয়টার্স ও আল জাজিরার তথ্যমতে, দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার তীব্রতা বাড়ছে এবং এই পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভিন্ন ও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর গত জুলাই মাসের শুরুর দিকে ওমান উপকূলের কাছে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়, যার মধ্যে কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী ট্যাংকারও ছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালায়। জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। এই সংঘাতের প্রেক্ষিতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর হরমোজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। তারা দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প ট্রানজিট রুট তৈরির মাধ্যমে এই জলপথের ব্যবস্থাপনায় অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ঘোষণা করেন যে এপ্রিল মাসে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি এখন আর কার্যকর নেই, তখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শেয়ার বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। হরমোজ প্রণালী বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে পরিচিত, যাকে সংঘাতের ক্ষেত্রে একটি সুইচ হিসেবে দেখা হয়। বর্তমানে হরমোজ প্রণালী ঘিরে যে নিয়ন্ত্রণ লড়াই শুরু হয়েছে, তা দুই দেশের কৌশলগত অবস্থানের বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে।

মার্চ মাসের যুদ্ধের সূচনালগ্নে যে ধরনের ব্যাপক সামরিক অভিযান দেখা গিয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতির সাথে তার বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে শুরু হওয়া প্রথম দফায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বড় বড় শহরগুলোতে বিমান হামলা চালিয়েছিল। সেই যুদ্ধের প্রথম দিনেই তেহরানে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হয়েছিলেন। তখনকার হামলাগুলো ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত এবং ইরানের সামরিক অবকাঠামো ধূলিসাৎ করার লক্ষ্যে পরিচালিত। কিন্তু বর্তমান লড়াই প্রধানত হরমোজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।

ইরানের পাল্টা হামলাগুলো এখন মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির আশেপাশে সীমাবদ্ধ রয়েছে। আগের তুলনায় বর্তমান হামলার ধরন অনেকটা নিয়ন্ত্রিত বা নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সংঘাতের ঝুঁকি কমেছে। বরং এই লড়াইয়ে উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল অবলম্বন করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই দেশ এখনো আলোচনার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আলোচনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যদিও যুদ্ধবিরতি অকার্যকর ঘোষণা করার পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে।

এই সংঘাতের মধ্যে কাতারের মতো দেশগুলো পর্দার আড়ালে কাজ করছে যাতে পরিস্থিতির আরও অবনতি না ঘটে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই যুদ্ধ নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে ট্রাম্প প্রশাসনকে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, কোনো যুদ্ধ শুরুর ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে যে প্রথম দফার যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ের সামরিক অভিযান সমাপ্ত হয়েছিল, তাই নতুন করে কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। এই আইনি মারপ্যাঁচ নিয়ে ওয়াশিংটনে বিতর্ক তুঙ্গে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে ইরানের সাথে এই যুদ্ধ মোটেও জনপ্রিয়তা পায়নি। মুদ্রাস্ফীতি এবং তেলের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। ভোটাররা সরকারের অর্থনৈতিক পদক্ষেপের সাথে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। ভোটের বাজারে এই অস্থিরতা রিপাবলিকান প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে বা জ্বালানির দাম আরও বৃদ্ধি পেলে ট্রাম্পের সামনে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরির আশঙ্কা প্রবল।

আগের দফার যুদ্ধের সাথে বর্তমান দফার আরও একটি বড় পার্থক্য হলো ইসরায়েলের বর্তমান অবস্থান। যুদ্ধের সূচনালগ্নে ইসরায়েল সক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিলে ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিল। মার্কো রুবিও-এর মতো মার্কিন কর্মকর্তারা তখন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে নেতানিয়াহু প্রশাসনই কার্যত ওয়াশিংটনকে যুদ্ধের পথে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু এবারের লড়াইয়ে ইসরায়েল সরাসরি তেমন কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখাচ্ছে না। লেবানন ও ইরান ইস্যুতে যে সমঝোতাগুলো হয়েছিল, তা ইসরায়েল পুরোপুরি মেনে চলছে না বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে।

ইরানের ওপর সামরিক চাপে ফেলার কৌশল পরিবর্তন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখন নিজেদের শক্তির প্রদর্শন করছে হরমোজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। এটি মূলত একে অপরকে কোণঠাসা করার একটি কৌশল। ইরান একদিকে যেমন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে চাইছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার ভয় পাচ্ছে। এই রেষারেষির মাঝখানে সাধারণ মানুষ পড়ছে চরম ভোগান্তিতে। মিনাব শহরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা যুদ্ধের বিভীষিকাময় রূপটিকেই তুলে ধরে।

পরিশেষে, এই সংঘাতের পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা এখনো অনিশ্চিত। দুই পক্ষই শক্তি প্রদর্শনে ব্যস্ত, কিন্তু এই লড়াইয়ে প্রকৃত বিজয়ী হওয়া কঠিন। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার অর্থ হলো বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি পাওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ফের বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বনেতারা যদি দ্রুত কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন, তবে পুরো অঞ্চল এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা বা আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা উভয় পক্ষের জন্যই এখন সময়ের দাবি।

banner
Link copied!