জাপানের জাতীয় ডায়েটে আইন পাসের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো একটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম টোকিও তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে দেশটির উচ্চকক্ষে এই আইন পাস হয়। এর আগে নিম্নকক্ষেও আইনটি পাস হয়েছিল। এই সংস্থাটি গঠনের পেছনে প্রধান লক্ষ্য হলো বিদেশি গুপ্তচরবৃত্তি, হস্তক্ষেপ এবং অন্যান্য হুমকি মোকাবিলা করা। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন সরকার এটিকে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
দীর্ঘদিন ধরে জাপান তাদের গোয়েন্দা তথ্যের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। জাপানের সংবিধানের অনুচ্ছেদ নয় অনুযায়ী শান্তিপ্রিয় অবস্থান বজায় রাখতে গিয়ে দেশটি এতদিন নিজস্ব কোনো শক্তিশালী বৈদেশিক গোয়েন্দা পরিষেবা গড়ে তোলেনি। তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে জাপান এখন নিজস্ব সক্ষমতা অর্জনের দিকে ঝুঁকছে। দেশটির বর্তমান সরকারের মতে, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া এবং চীনের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় নিজস্ব গোয়েন্দা ব্যবস্থা অপরিহার্য।
নতুন এই আইনের মাধ্যমে দুটি প্রধান কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। একটি হলো জাতীয় গোয়েন্দা পরিষদ, যা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কমান্ড সেন্টার হিসেবে কাজ করবে। অপরটি হলো গোয়েন্দা ব্যুরো, যা মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। টোকিও তাদের বিদ্যমান মন্ত্রিসভা গোয়েন্দা ও গবেষণা অফিসকে পুনর্গঠন করে এই নতুন রূপ দিচ্ছে। পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়া জাপানকে এই গোয়েন্দা সংস্থা গঠনে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জাপানি নীতিনির্ধারকদের মতে, বর্তমান বিকেন্দ্রীভূত গোয়েন্দা ব্যবস্থায় একে অপরের সাথে সমন্বয় করা কঠিন এবং তথ্য আদান-প্রদান বাধাগ্রস্ত হয়। বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশি প্রতিনিধিদের সন্দেহজনক কার্যকলাপের ওপর নজরদারি চালানো বা তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পর্যাপ্ত আইনি ভিত্তি পাওয়া কঠিন ছিল। এই দুর্বলতাগুলো দূর করে একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জাপানকে গুপ্তচরবৃত্তির স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহার করত এবং এখন চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলোও অনুরূপ কৌশল অবলম্বন করছে।
নতুন এই উদ্যোগের ফলে জাপানের অভ্যন্তরে কিছু মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাষ্ট্রীয় নজরদারির কারণে জাপানি নাগরিকদের মধ্যে যে আস্থার সংকট ছিল, তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। তবে বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, খুব সামান্য অংশই এই সংস্কারের বিরোধী। তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ পুরোনো ট্যাবুর তোয়াক্কা না করে জাতীয় নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, জাপান এখন তাদের দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল সামরিক ও গোয়েন্দা নীতি থেকে বেরিয়ে এসে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে।
