সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

গাজায় বিদেশি বাহিনী অনুমোদন, ইসরায়েলের রাজনৈতিক কৌশল

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৭, ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম

গাজায় বিদেশি বাহিনী অনুমোদন, ইসরায়েলের রাজনৈতিক কৌশল

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধের জন্য একটি বিস্তৃত রূপরেখা সমর্থন করার কয়েক মাস পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা ক্যাবিনেট ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া অঞ্চলটির একটি নির্দিষ্ট পকেটে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে বিদেশি নিরাপত্তা বাহিনী প্রবেশ করার অনুমতি দিয়েছে বলে আল জাজিরা ও রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশ দফার শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর প্রায় দুইশ সদস্যের একটি দল দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরের একটি নির্ধারিত স্থানে মোতায়েন করা হবে। মরক্কো ও উগান্ডার মতো দেশগুলোর সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই দলটিকে মূলত একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে বাস্তবভিত্তিক সুবিধার চেয়ে একটি হিসাব-নিকাশ করা কূটনৈতিক চাল বলে আখ্যা দিয়েছেন। মার্কিন সমর্থনপুষ্ট শান্তি প্রক্রিয়া থমকে থাকা এবং গাজায় ইসরায়েলের প্রাণঘাতী আক্রমণ অব্যাহত থাকার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি কোনো প্রকৃত শান্তির দিকে অগ্রগতির লক্ষণ নয় বরং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফরের আগে মার্কিন সরকারের চাপ কমানোর এবং একই সাথে গাজা ভূখণ্ডের ভৌগোলিক বিভাজন বজায় রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র।

গাজাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওয়াসাম আফিফা আল জাজিরাকে জানিয়েছেন যে নেতানিয়াহু মূলত গাজা থেকে পূর্ণাঙ্গ সেনা প্রত্যাহারের দাবিকে নাকচ করতেই ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন। এর বিকল্প হিসেবে তিনি এই ধরনের ছোট অর্জন বা নিয়ন্ত্রিত পদক্ষেপ উপস্থাপন করছেন যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে থাকে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হ্যারেটজের তথ্যমতে প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রায় পাঁচশ মরক্কো সেনা মোতায়েনের কথা থাকলেও তা কমিয়ে দুইশজনে আনা হয়েছে যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে নিরাপত্তা ক্যাবিনেট এই মোতায়েনকে আরও ছোট এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ধাপে বিভক্ত করেছে।

মোতায়েন করা এই আন্তর্জাতিক বাহিনী সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পূর্ণ সমন্বয়ে কাজ করবে। ইসরায়েলি গণমাধ্যম ইয়েডিঅথ আহরোনোথ নিশ্চিত করেছে যে ক্যাবিনেট বৈঠকে কেবল জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন কারণ তার মতে প্রতিরোধ যোদ্ধা বাহিনী পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র সংবরণ করেনি। তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছেন যে গাজা সমস্যার একমাত্র সমাধান হলো সেখান থেকে বাসিন্দাদের স্থানান্তরে উৎসাহিত করা।

ইসরায়েলি সরকারের তথ্য অনুযায়ী দেশটির সামরিক বাহিনী তথাকথিত হলুদ রেখার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছেই রাখবে। এই এককভাবে আরোপিত সীমানার কারণে গাজা ভূখণ্ডের প্রায় সত্তুর শতাংশ এলাকা এখনো সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ইসরায়েল জানিয়েছে যে প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর পূর্ণ অস্ত্র সংবরণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো ধরনের সেনা প্রত্যাহার করবে না। যা কম স্পষ্ট তা হলো, দুইশ সদস্যের একটি ছোট দল এমন একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় কীভাবে নিরাপত্তা পরিচালনা করবে যেখানে মূল সামরিক নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতেই রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে যে গাজাকে ছোট ছোট অঞ্চলে বিভক্ত করে বহিরাগত বাহিনী দিয়ে পরিচালনা করার প্রচেষ্টা মূল সমস্যার সমাধান করবে না। যতক্ষণ না পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি এবং দখলদারিত্বের অবসান ঘটছে ততক্ষণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাহিনীর এমন সীমিত উপস্থিতি কেবল দখলদারিত্বের সময়কাল বাড়াবে। নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপ মূলত ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় অধিকার এবং গাজার ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে পণ্ড করার নতুন একটি প্রচেষ্টা বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

banner
Link copied!