যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড যখন দখলকৃত পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেন, তখন বিশ্বজুড়ে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা একটি মৌলিক কূটনৈতিক ধারণার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সংঘাতে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পথ হিসেবে বিবেচিত দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান কি তবে পুরোপুরি মৃত, নাকি কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এখনও তা পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব? এই প্রশ্নটি এখন কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূরাজনীতিতে এটি এক কেন্দ্রীয় বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের এই পদক্ষেপকে দীর্ঘদিন ধরে চলমান নিষ্ক্রিয়তার পর একটি প্রতীকী কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, বসতিগুলোর লাগাতার ও দ্রুত সম্প্রসারণ কেবল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনই নয়, বরং এটি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে দিন দিন চিরতরে মুছে দিচ্ছে। যুক্তরাজ্যসহ মোট বারোটি দেশের যৌথ অবস্থান বা সমর্থন প্রমাণ করে যে পশ্চিমা দেশগুলোর একটি অংশের মধ্যে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন নীতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির মাঠে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কতটা ফলপ্রসূ হতে পারে, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকরা।
কিংস কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রভাষক তাহানি মুস্তফা আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ব্রিটিশ সরকারের এই নতুন পদক্ষেপগুলোকে অত্যন্ত সীমিত বা সাধারণ বলে মনে হয় এবং এগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদী ambitions বা লক্ষ্যের ওপর কোনো সুদূরপ্রসারী বা দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে পারবে না। তার মতে, গত তিন দশক ধরে যেভাবে অবিরাম গতিতে বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে, তাতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড বর্তমানে বিচ্ছিন্ন কিছু জনপদের সমষ্টিতে পরিণত হয়েছে। একটি কার্যকর ও ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার ন্যূনতম সক্ষমতাও ফিলিস্তিনি ভূমি এখন প্রায় হারাতে বসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দশকের পর দশক ধরে চলা বসতি সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে জোরালো কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান কেবল একটি কূটনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়েছে। কেবল কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা বা কতিপয় প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্থনৈতিক কড়াকড়ি আরোপ করে বর্তমান ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির গতিপথ পরিবর্তন করা অসম্ভব। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হলে কেবল নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়, বরং আরও অনেক বেশি সাহসী, সুনির্দিষ্ট ও আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রধান পশ্চিমা শক্তিগুলোর দ্বিমুখী নীতি এবং ইসরায়েলি সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে শান্তি আলোচনার পথ আরও সংকুচিত হয়ে এসেছে। পশ্চিম তীরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারীদের সংখ্যা এবং তাদের অবকাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে দুই রাষ্ট্রের সহাবস্থানের কোনো বাস্তবসম্মত রূপরেখা তৈরি করা অত্যন্ত দুরূহ এক চ্যালেঞ্জ। ফলে ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও, তা ফিলিস্তিনের মাটিতে শান্তি ফেরাতে বা দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানকে পুনরুজ্জীবিত করতে কতটা সক্ষম হবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়।
