বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

জার্মানিতে কি বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা ফিরছে?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

জার্মানিতে কি বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা ফিরছে?

ইউরোপের রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণে জার্মানি বর্তমানে এক বড় ধরনের প্রতিরক্ষা সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। রুশ আগ্রাসনের পর থেকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর যে প্রক্রিয়া বার্লিন শুরু করেছে, তা এখন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে। আল জাজিরা এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে প্রকাশ যে চলতি বছরে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের মাধ্যমে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় আগামী দিনে দেশটিতে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা বা কনস্ক্রিপশন পুনরায় চালু করা হবে কি না, তা নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

জার্মানির বর্তমান সামরিক কৌশল অনুসারে, দেশটির সশস্ত্র বাহিনী বা বুন্দেসওয়ার তাদের সক্রিয় সৈন্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে চায়। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের মাধ্যমে সৈন্য সংখ্যা দুই লক্ষ ষাট হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি রিজার্ভ বাহিনীতেও বড় ধরনের লোকবল যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে কার্যকর হওয়া আধুনিকায়ন আইনের অধীনে আঠারো বছর বয়সী তরুণদের কাছে তিন লক্ষেরও বেশি চিঠি পাঠানো হয়েছে। এই চিঠির মাধ্যমে তাদের শারীরিক যোগ্যতা, শিক্ষা এবং সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ইচ্ছা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে।

তবে সরকারের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য হাজার হাজার তরুণ ধর্মীয় ও নৈতিক কারণ দেখিয়ে আবেদন করেছেন। এর আগে সামরিক নীতির কিছু কঠোর ধারা নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে পড়েছিল প্রশাসন। দেশের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। তরুণদের এই আন্দোলন মূলত বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার বিরুদ্ধে এবং সরকারের সামরিকীকরণের নীতির প্রতি তাদের অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

ঐতিহাসিকভাবে জার্মানিতে দীর্ঘ সময় ধরে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু ছিল যা পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালে স্থগিত করা হয়েছিল। ঠান্ডা যুদ্ধ পরবর্তী শান্ত পরিবেশ এবং বাজেট হ্রাসের নীতির কারণে সেই সময় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের পরিবর্তনের কারণে জার্মানি তার পূর্বের নীতি থেকে সরে আসার কথা ভাবছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নিজেদের দায়িত্ব বাড়ানোর অংশ হিসেবেই বার্লিন এই সামরিক আধুনিকায়নের পথ বেছে নিয়েছে। তবে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগের বর্তমান হার সরকারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়।

পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে দেশটির নীতি নির্ধারকদের মতে আগামী বছরের জুলাই মাসের মধ্যে বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপে ছাত্রসমাজ ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। শিক্ষার্থী সংগঠনের প্রতিনিধিরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে তরুণরা যুদ্ধ করার চেয়ে নিজেদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে চায়। সরকারের তরফ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষের মন থেকে আশঙ্কার মেঘ কাটছে না।

আগামী দিনে জার্মানির প্রতিরক্ষা নীতি কোন পথে এগোবে তা মূলত নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। একদিকে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষার চাপ এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ যুব সমাজের প্রতিবাদের মুখে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেয়ারের সরকারকে এক কঠিন ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করতে হচ্ছে। বিশ্ববাসীর নজর এখন বার্লিনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। এই সংকট নিরসনে সরকার শেষ পর্যন্ত কোন কূটনৈতিক বা প্রশাসনিক পথ বেছে নেয় এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয় কি না, সেটাই এখন দেখার মূল বিষয়।

banner
Link copied!