উগান্ডার প্রখ্যাত বিরোধীদলীয় নেতা এবং চারবারের সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কিসা বেসিগে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় আদালতে শুনানি চলাকালে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলার পর তাকে হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বা আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে বলে রয়টার্স এবং আল জাজিরা জানিয়েছে।
বুধবার রাজধানী কাম্পালার একটি আদালতে এই নাটকীয় ঘটনা ঘটে। সত্তর বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক বিচারকের সামনে তার নিজস্ব আইনজীবীদের উপস্থিতির দাবি জানিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করছিলেন। এসোসিয়েটেড প্রেস বা এপি নিউজ জানিয়েছে যে, প্রসিকিউশনের প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি চলাকালে বেসিগে বারবার বিচারককে এই ভিত্তিহীন বিচারকাজ থামাতে বলছিলেন। একপর্যায়ে তিনি কাঠগড়ার মধ্যেই পেছন দিকে হেলে পড়ে যান। এরপর কারা নিরাপত্তারক্ষীরা দ্রুত তাকে আদালত কক্ষ থেকে বের করে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
বেসিগের স্ত্রী এবং জাতিসংঘের এইডস কর্মসূচির বর্তমান প্রধান উইনি বিয়ানিমা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন যে, তার স্বামী বর্তমানে কাম্পালার সরকারি মুলাগো ন্যাশনাল রেফারেল হাসপাতালে সম্পূর্ণ অজ্ঞান অবস্থায় রয়েছেন। বৃহস্পতিবার তিনি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন যে বেসিগে কথা বলতে পারছেন না এবং চিকিৎসকদের দেওয়া কোনো ধরনের ব্যথার অনুভূতিতেও সাড়া দিচ্ছেন না। পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের ওপর অনাস্থা জানিয়ে তাকে একটি সরকারি হাসপাতাল থেকে সরিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নিজস্ব চিকিৎসকের অধীনে নেওয়ার আবেদন জানানো হলেও আদালত এখনো সেই অনুমতি দেয়নি।
গত ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে প্রতিবেশী দেশ কেনিয়া থেকে কিসা বেসিগে এবং তার ঘনিষ্ঠ এক সহযোগীকে আটক করে উগান্ডায় ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর থেকেই তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর অভিযোগে কারাগারে বন্দি রয়েছেন। উগান্ডা সরকারের প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, তিনি এবং তার দল সুইজারল্যান্ড, গ্রিস এবং কেনিয়ায় বসে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে বর্তমান সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছিলেন। তবে তার সমর্থক এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। বেসিগে তার নিজের পছন্দের আইনজীবীদের মাধ্যমে আইনি লড়াই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু উগান্ডা কর্তৃপক্ষ তার প্রধান আইনজীবী ইলিয়াস লুকওয়াগোকে রাষ্ট্রদ্রোহের তথ্য গোপন করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে এবং আরেকজন আইনজীবীকে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। এর প্রতিবাদেই বেসিগে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীদের প্রত্যাখ্যান করে বিচারকের সাথে তর্কে জড়িয়েছিলেন।
উগান্ডায় দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইয়াওয়েরি মুসেভেনি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, মুসেভেনি সরকার দেশে বিরোধী মত দমনে ব্যাপক মাত্রায় ধরপাকড় চালাচ্ছে। কিসা বেসিগে একসময় প্রেসিডেন্ট মুসেভেনির ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও কাজ করেছেন, কিন্তু পরবর্তীতে মতবিরোধের কারণে তিনি সরকারের প্রধান সমালোচকে পরিণত হন। দেশের আরেক জনপ্রিয় বিরোধী নেতা ববি ওয়াইনও সরকারের রোষানলে পড়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কারাবন্দি হওয়ার পর থেকে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো কিসা বেসিগেকে। এর আগে গত ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কারাগারে অনশন করার কারণে তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়েছিল। যা কম স্পষ্ট তা হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে উগান্ডার আদালত এই প্রবীণ রাজনীতিককে অবিলম্বে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি দেবে কি না।
