আর্জেন্টিনা পুরুষ ফুটবল দল সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপের একটি নাটকীয় কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে পরাজিত করে সেমিফাইনালে উন্নীত হয়েছে বলে বিবিসি স্পোর্টস নিশ্চিত করেছে। তীব্র উত্তেজনাকর এবং বিতর্কিত এই ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেজের একটি চমৎকার দূরপাল্লার শটের কল্যাণে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা জয় নিশ্চিত করে। এই জয়ের ফলে সেমিফাইনালে টমাস টুখেলের ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আমেরিকান এই পরাশক্তি। অন্যদিকে দ্বিতীয়ার্ধে দশ জনের দলে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও বীরত্বের সাথে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হওয়ায় সুইজারল্যান্ডের শিবিরে নেমে আসে চরম হতাশা।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে সুইজারল্যান্ডের তারকা স্ট্রাইকার ব্রিল এমবোলো ডাইভিং বা অভিনয়ের দায়ে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি তথা ভিএআর পর্যালোচনার পর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ম্যাচটি সম্পূর্ণ নতুন মোড় নেয়। প্রথমার্ধে ইতিমধ্যেই একটি হলুদ কার্ড পাওয়া এমবোলো মাঠের মাঝখানে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের দ্বারা ফাউলের শিকার হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছিল এবং রেফারি পারেদেসকে কার্ড দেখিয়েছিলেন। তবে ভুল খেলোয়াড়কে সনাক্তকরণের নিয়মের আওতায় রেফারিকে ভিএআর মনিটর পরীক্ষা করার জন্য ডাকা হলে রিপ্লেতে দেখা যায় যে সুইজারল্যান্ডের ওই খেলোয়াড় স্পষ্টভাবেই ফাউলের ভান করেছিলেন। ফলে পারেদেসের হলুদ কার্ডটি বাতিল করা হয় এবং এমবোলোকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হলে সুইজারল্যান্ড দল ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
সুইজারল্যান্ডের এই বিপর্যয়ের ঠিক পাঁচ মিনিট আগে তারা ম্যাচে সমতা ফিরিয়েছিল এবং ম্যাচের বেশিরভাগ সময় বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছিল। ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটে লিওনেল মেসির কর্নার থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার হেডের সাহায্যে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নিলে অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন তারা সহজে জয় পাবে। তবে আর্জেন্টিনা তাদের এই অগ্রগামিতা ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরতে ব্যর্থ হয় এবং সুইজারল্যান্ড ধীরে ধীরে খেলায় ফিরে আসে। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে নটিংহ্যাম ফরেস্টের উইঙ্গার ড্যান এনডয় বাম দিক থেকে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে রিকার্ডো রদ্রিগেজের সাথে ওয়ান-টু পাস খেলে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের পায়ের নিচ দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন।
এমবোলোর লাল কার্ডের পর আর্জেন্টিনা খেলায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে সুইস রক্ষণভাগ ভাঙার সংগ্রামের পর আলভারেজের জাদুকরী শটে স্বস্তি পায়। ম্যাচটি যখন অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় তখন আলভারেজ ২৫ গজ দূর থেকে একটি বাঁকানো শটে সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলকে পরাস্ত করেন। পিছিয়ে পড়ার পর সুইজারল্যান্ড সমতা ফেরানোর জন্য মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালালে আর্জেন্টিনা পাল্টা আক্রমণ থেকে আরেকটি গোল আদায় করে নেয়। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত সময়ের ১২০+১ মিনিটে লাউতারো মার্টিনেজ গোল করে আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখেন।
টনা তৃতীয় ম্যাচের মতো আর্জেন্টিনা একটি বিশৃঙ্খল জয় তুলে নিয়েছে এবং ফেভারিট হিসেবে মাঠে নেমেও তাদের পারফরম্যান্স আশানুরূপ ছিল না। ম্যাচের প্রথমার্ধে ম্যাক অ্যালিস্টারের গোলের পর দ্বিতীয় অর্ধেকের অতিরিক্ত সময়ে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের একটি অ্যাক্রোবেটিক শট কোবেল চমৎকারভাবে রক্ষা করার আগে আর্জেন্টিনা দীর্ঘ ৯০ মিনিট কোনো অন-টার্গেট শট নিতে পারেনি। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে বেশ ব্যস্ত সময় পার করতে হয়েছে এবং তিনি এনডয়ের একটি খুব কাছ থেকে নেওয়া শট প্রতিহত করেন। এছাড়াও মার্টিনেজ হেড থেকে আসা বেশ কয়েকটি আক্রমণ এবং গ্রানিত জাকার একটি দূরপাল্লার শট দক্ষতার সাথে রুখে দেন।
আর্জেন্টিকার এই শক্তিশালী আক্রমণভাগের প্রাচুর্যের কারণে তারা শেষ পর্যন্ত জয়বঞ্চিত হয়নি, যদিও লিওনেল মেসি এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কোনো গোল করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এই ম্যাচের মাধ্যমে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে টানা ১৫টি ম্যাচে গোল করার গৌরব অর্জন করেছে যার মধ্যে শেষ ১১টি ম্যাচেই তারা অন্তত দুটি করে গোল করেছে। এই অনন্য রেকডের মাধ্যমে তারা প্রতিযোগিতার ইতিহাসে টানা সবচেয়ে বেশি ম্যাচে একাধিক গোল করার উরুগুয়ের ১৯৩০ থেকে ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক রেকর্ডটি ভেঙে দিয়েছে। গোল না পেলেও মেসি তাঁর সুবিশাল কীর্তিতে আরেকটি নতুন রেকর্ড যুক্ত করেছেন এবং বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ১০টি অ্যাসিস্ট করার গৌরব অর্জন করেছেন।
সুইজারল্যান্ড দলের জন্য এই ম্যাচটি একটি দীর্ঘ আক্ষেপের গল্প হয়ে থাকবে কারণ তারা ম্যাচের দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনার চেয়ে ভালো ফুটবল খেলেছিল এবং এমবোলোর লাল কার্ডটিই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বেশ কিছু শারীরিক আক্রমণ ও ফাউল কোনো শাস্তি ছাড়াই পার পেয়ে যাওয়ায় হয়তো এমবোলো আরেকটি কঠিন ট্যাকল অনুমান করে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। পুরো ম্যাচে মোট ৩২টি ফাউল হয়েছে যার মধ্যে ১৪টিই করেছে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা, তবে অতিরিক্ত সময়ের আগে লাতিন আমেরিকার দলটির কেউ কোনো কার্ড দেখেনি। যা কম স্পষ্ট তা হলো চোটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ মিডফিল্ডার জোহান মানজাম্বির অনুপস্থিতি তাদের মাঝমাঠকে কতটা দুর্বল করেছিল এবং এই কোয়ার্টার ফাইনালের অভিশাপ থেকে সুইসরা কবে মুক্তি পাবে।
