স্নুকার বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু শেফিল্ডের ক্রুসিবল থিয়েটার সোমবার এক নতুন ইতিহাস প্রত্যক্ষ করল। মাত্র ২২ বছর বয়সে বিশ্ব স্নুকার চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতে নিয়েছেন চীনের তরুণ সেনসেশন উ ইজে। এক শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে অভিজ্ঞ শন মারফিকে ১৮-১৭ ফ্রেমে পরাজিত করে তিনি এই গৌরব অর্জন করেন। উ ইজের এই জয় কেবল একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি বিশ্ব স্নুকারে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের এক জোরালো ঘোষণা। গত বছর ঝাও জিনটংয়ের পর টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোনো চীনা খেলোয়াড় এই মর্যাদাপূর্ণ ট্রফিটি নিজের করে নিলেন। রয়টার্স ও বিবিসি স্পোর্টসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উ ইজে এখন বিশ্ব স্নুকার ইতিহাসের দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম চ্যাম্পিয়ন।
উ ইজের এই রাজকীয় উত্থানের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প এবং তার পরিবারের অসামান্য আত্মত্যাগ। লানঝু শহর থেকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে পেশাদার স্নুকার খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাবার সাথে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। শেফিল্ডের একটি জানালাবিহীন ছোট্ট ফ্ল্যাটে বাবার সাথে একই বিছানা ভাগ করে দিন কাটিয়েছেন এই স্বপ্নবাজ তরুণ। সেই সময় তার মা চীনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মায়ের অসুস্থতার খবর তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করলেও পরিবারের জেদ ছিল একটাই—উ ইজেকে বিশ্বসেরা হতে হবে। উ ইজে জানান যে তার মা তাকে বারবার বলেছেন বাড়িতে ফিরে না আসতে, যাতে তার পেশাদার র্যাঙ্কিংয়ে কোনো প্রভাব না পড়ে। মায়ের সেই আত্মত্যাগই আজ তাকে বিশ্বের চার নম্বর খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
স্নুকার মূলত একটি প্রথাগত ও শৃঙ্খলিত খেলা হিসেবে পরিচিত হলেও উ ইজে সেখানে নিয়ে এসেছেন আক্রমণাত্মক ও আধুনিক ঘরানার শৈলী। তার এই খেলার ধরনকে কিংবদন্তি রনি ও’সুলিভান এবং স্টিভ ডেভিসের মতো তারকারা আগেই প্রশংসা করেছিলেন। স্টিভ ডেভিস বিবিসি-র বিশ্লেষণে বলেন যে আধুনিক স্নুকারে কেবল নিরাপদ খেলে জেতা সম্ভব নয়, উ ইজের মতো আক্রমণাত্মক মেজাজই এখনকার সাফল্যের চাবিকাঠি। তার প্রতিটি শট এবং আত্মবিশ্বাস দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। এমনকি শন মারফির মতো অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষকেও তিনি শেষ ফ্রেমের স্নায়ুযুদ্ধে টেক্কা দিয়েছেন। এই জয় প্রমাণ করে যে স্নুকারে এখন আর ব্রিটিশদের একক আধিপত্যের দিন নেই।
চীনের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই জয়ের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। আন্তর্জাতিক স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফাইনাল ম্যাচটি চলাকালীন চীনে প্রায় ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখেছিলেন। উ ইজের নিজ শহর লানঝু, যেখানে বড় কোনো ক্রীড়া ঐতিহ্যের ইতিহাস নেই, সেখানে তাকে এখন বীরের মর্যাদায় দেখা হচ্ছে। চীনের ভাইস গভর্নর ইতিমধ্যে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বর্তমানে বিশ্ব স্নুকারের সেরা ১৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে পাঁচজনই চীনের, যা এই খেলার বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি বড় পরিবর্তন নির্দেশ করছে। আগামী মৌসুমে সেরা ৩২ জনের মধ্যে ১০ জনই চীনা খেলোয়াড় থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড স্নুকার ট্যুরের চেয়ারম্যান জেসন ফার্গুসন এই জয়কে `জোয়ারের পরিবর্তন` হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে উ ইজে এবং তার বাবা যে কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এখানে পৌঁছেছেন তা অভাবনীয়। স্নুকারের এই নতুন যুগে উ ইজে কেবল একজন চ্যাম্পিয়ন নন, বরং তিনি একটি প্রজন্মের প্রতিনিধি যারা খেলাটিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলছেন। উ ইজে এখন তার মাকেও যুক্তরাজ্যে নিজের পাশে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছেন। মায়ের সেই কষ্টের দিনগুলো এবং বাবার সাথে জানালাবিহীন ঘরে কাটানো রাতগুলো আজ সার্থক হয়েছে। স্নুকার বিশ্ব এখন একজন নতুন সুপারস্টারকে বরণ করে নিচ্ছে যার লক্ষ্য ভবিষ্যতে আরও অনেক শিরোপা জয় করা।
