অনলাইন ডেটিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে ভুয়া প্রোফাইল এবং আর্থিক প্রতারণার সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলায় ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে নেমেছে নতুন কিছু স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান। প্রচলিত বড় অ্যাপগুলোর মতো শুধু সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর পেছনে না ছুটে এই নতুন উদ্যোগগুলো প্রকৃত ও নির্ভরযোগ্য মানুষ খুঁজে দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তিগত ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা এবং দ্রুত সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ তৈরি করে ডেটিং অ্যাপে প্রতারণা বন্ধে কাজ করছে তারা।ভার্চুয়াল জগতের এই কৃত্রিম সম্পর্ক ও প্রতারণামূলক ফাঁদ এখন ব্যবহারকারীদের জন্য বড় সংকটের কারণ।
যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ লন্ডনের ক্রয়ডনের বাসিন্দা ডেনি স্মিথ ‘গীক মিট ক্লাব’ নামে একটি বিশেষ ডেটিং সাইট চালু করেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একটি কৃত্রিম পরিখায় ভ্রমণের সময় সমমনা ইতিহাস ও বিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির ধারণা তার মাথায় আসে। স্মিথ নিজে প্রতিটি আবেদন ব্যক্তিগতভাবে যাচাই করেন এবং প্রতি মাসে প্রায় ৫০টি ভুয়া আবেদন সরাসরি বাতিল করে দেন। তিনি জানান, একবার এক আবেদনকারী ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের ছবি জমা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার চেষ্টা করেছিলেন। বর্তমানে তার ক্লাবের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০ জন এবং তিনি চান সদস্যরা ভার্চুয়াল স্ক্রিন থেকে দূরে এসে বাস্তব জীবনে কফি শপ বা পার্কে দ্রুত দেখা করুক।
একইভাবে লন্ডনের সিটি ব্যাংকার জো ম্যাসন ‘চেরি ডেটিং’ নামে একটি অ্যাপ তৈরি করেছেন। নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লক্ষ্য করেন যে ডেটিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে অনেকেই মিথ্যা পরিচয় বা এক দশকের পুরোনো ছবি ব্যবহার করে সম্পর্ক তৈরি করেন, যাকে সাইবার অপরাধের ভাষায় ‘ক্যাটফিশিং’ বলা হয়। এই সমস্যা সম্পূর্ণ দূর করতে চেরি ডেটিং একটি বিশেষ আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করছে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকের একটি culinary তাৎক্ষণিক সেলফির সঙ্গে তার পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের ছবি সরাসরি মিলিয়ে অ্যাকাউন্ট যাচাই করা হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেভাবে অ্যাকাউন্টের জালিয়াতি সনাক্ত করে, এখানেও ঠিক একই আইডি কার্ড মেলানোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। অনেক ভুয়া ব্যবহারকারী পরিচয়পত্র যাচাইয়ের এই কড়া নিয়মের ভয়ে অ্যাপে প্রবেশ করা থেকেই বিরত থাকছেন। ম্যাসনের পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪৭ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক মনে করেন বর্তমান কোনো ডেটিং অ্যাপই তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
এছাড়াও ৪০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে এসব অ্যাপের কারণে মানুষের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ বা অনুপ্রেরণা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। ডেটিং সাইটগুলোতে পার্টনারদের সামঞ্জস্যতা পরিমাপের জন্য চেরি ডেটিং বিশেষ স্কোরিং ব্যবস্থাও রেখেছে, যাতে ব্যবহারকারীরা কম সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রোফাইলে সময় নষ্ট না করেন। প্রযুক্তি নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান সামসাব ২ হাজার ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারীর ওপর একটি জরিপ চালিয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, প্রায় ৫৪ শতাংশ মানুষ নিজেদের প্রোফাইলকে কৃত্রিমভাবে আকর্ষণীয় করতে চ্যাটজিপিটি বা কোপাইলটের মতো জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
ডেটিং কোচ জোসেলিন পেঙ্কু মনে করেন, নিজের অনুভূতি প্রকাশে দুর্বলদের জন্য এআই ব্যবহার করা উপকারী হতে পারে, তবে এআই প্রম্পটে নিজের জীবনের আসল লক্ষ্য, মূল্যবোধ এবং পরিবারের পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা জরুরি। টেক সেক্টরের পটভূমি থাকা পেঙ্কু নিজে অনলাইন ডেটিংয়ের বিরোধী নন, কারণ তার ৭৯ বছর বয়সী বাবা একটি অ্যাপের মাধ্যমে নিজের জীবনসঙ্গী খুঁজে পেয়েছেন। পেঙ্কুও নতুন সম্পর্কগুলোকে ডিজিটাল স্ক্রিনের বন্দিদশা থেকে বের করে দ্রুত বাস্তব জীবনের মুখোমুখি করার পক্ষে মত দিয়েছেন। নিজের ক্লায়েন্টদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ও নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ভাবার সুযোগ করে দিতে তিনি মে মাসে পর্তুগালের অ্যাজোরস দ্বীপে একটি বিশেষ সেশনের আয়োজন করেছিলেন।
