যুক্তরাজ্যের অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী যৌথভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি মানুষের নিখুঁত নকল বা ডিপফেক ছবি শনাক্ত করার একটি যুগান্তকারী প্রশিক্ষণ পদ্ধতি তৈরি করেছেন বলে বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। সাম্প্রতিক এই আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে সাধারণ মানুষকে নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ওপর সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিলে তারা খুব সহজেই computers তৈরি ভুয়া ছবি ধরে ফেলতে সক্ষম হন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি বর্তমান সময়ে দিন দিন এত বেশি নিখুঁত ও উন্নত হচ্ছে যে সাধারণ মানুষের পক্ষে খালি চোখে আসল ও নকলের নিখুঁত পার্থক্য করা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়ছে। পূর্বে প্রযুক্তির কিছু সাধারণ ভুল যেমন হাতের অতিরিক্ত আঙুল বা অদ্ভুত কানের দুল দেখে নকল ছবি চেনা সহজ হলেও বর্তমানের উন্নত মডেলগুলো সেসব ত্রুটি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছে।
এই গবেষণার আন্তর্জাতিক দলটির প্রধান এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইমোশনস অ্যান্ড ফেসেস ল্যাবের পরিচালক অধ্যাপক অ্যামি ডাওয়েল জানান যে তারা মানুষের মুখমণ্ডলের ছয়টি বিশেষ গুণগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে এই প্রশিক্ষণ মডিউলটি তৈরি করেছেন। গবেষকরা গবেষণার স্বার্থে স্টাইলগ্যান৩ নামের একটি অত্যন্ত উন্নত এআই ইমেজ টুলের সাহায্যে হাজার হাজার কৃত্রিম মানুষের মুখের ছবি তৈরি করেছিলেন যা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বাস্তবসম্মত মুখমণ্ডল প্রস্তুতকারক হিসেবে পরিচিত। এই ছবিগুলো দিয়ে তারা অংশগ্রহণকারীদের চোখের দৃষ্টি ও অনুভূতির পরীক্ষা নেন যেখানে দেখা যায় যে মানুষের সাধারণ চোখকে সহজেই ফাঁকি দেওয়া সম্ভব। ডক্টর ক্লেয়ার সাদারল্যান্ড এই গবেষণার যুক্তরাজ্য অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং তিনি জানান যে নিয়মিত এআই ছবি দেখতে দেখতে তাদের নিজেদের মধ্যেই এক ধরনের সহজাত ধারণা তৈরি হয়েছিল যা পরবর্তীতে গবেষণার রূপ নেয়।
গবেষকরা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য যে box প্রধান বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন সেগুলো হলো মুখমণ্ডলের প্রতিসাম্য, অনুপাত, আকর্ষণ, স্বতন্ত্রতা, অভিব্যক্তি এবং স্মরণযোগ্যতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাধারণত মানুষের মুখের স্বাভাবিক অসামঞ্জস্যতা যেমন একটি চোখের পাতার সামান্য ঝুলে থাকা কিংবা একটু বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলতে প্রায়শই ব্যর্থ হয়। গবেষকদের মতে কোনো ছবি যদি দেখতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিখুঁত বা সুন্দর মনে হয় তবে সেটি আসলে ভুয়া হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে কম্পিউটারের তৈরি মুখগুলো সাধারণত গড়পড়তা চেহারার চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় এবং কম আবেগহীন দেখায় যা মানুষের ভিড়ে চট করে চেনা যায় না এবং এগুলো মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয় না।
গবেষণাগারে পরিচালিত দীর্ঘ পরীক্ষায় দেখা গেছে যে মাত্র এক ঘণ্টার একটি বিশেষ প্রশিক্ষণের পর অংশগ্রহণকারীদের ডিপফেক ছবি চেনার সঠিকতার হার প্রায় ৪০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে সরাসরি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে কয়েকজন অংশগ্রহণকারী সম্পূর্ণ শতভাগ নির্ভুলভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ছবি নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা মানুষের মস্তিস্ককে এমনভাবে অভ্যস্ত করে তোলে যা জেনারেটিভ এআই মডেলের বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করার পদ্ধতির সাথে হুবহু মিলে যায়। গবেষকরা আরও উল্লেখ করেছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সাধারণত তরুণ শ্বেতাঙ্গদের ছবির ওপর বেশি প্রশিক্ষিত হওয়ার কারণে অ-শ্বেতাঙ্গ কিংবা খুব বয়স্ক ও কম বয়সীদের নিখুঁত অবয়ব তৈরিতে প্রযুক্তির কিছু দুর্বলতা এখনও রয়ে গেছে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই প্রশিক্ষণ পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া কোটি কোটি ডিপফেক ছবির বিরুদ্ধে সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের কতটা বাস্তবসম্মত সুরক্ষা দিতে পারবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র তাদের প্রযুক্তি আরও উন্নত করলে এই কৌশলের কার্যকারিতা কতদিন বজায় থাকবে। তবে এই গবেষণার ফলে অংশগ্রহণকারীদের আত্মবিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যা তাদের সাইবার জগতে যেকোনো সন্দেহজনক কন্টেন্ট যাচাই করতে সাহায্য করবে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে অতি আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিরাই সাধারণত ডিপফেক ছবি শনাক্ত করতে সবচেয়ে বেশি ভুল করে থাকেন এবং জালের শিকার হন। গবেষকরা আশা করছেন যে এই নতুন প্রশিক্ষণ মডিউলটি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
