ভারতে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনের প্রাক্কালে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশে, উম্মুক্ত স্থানে বা সরকারি জায়গায় যৌথভাবে ঈদের নামাজ আদায়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে বহু এলাকার মসজিদ কমিটিগুলো বাধ্য হয়ে মুসল্লিদের শিফটে বা দফায় দফায় নামাজ আদায়ের অনুরোধ জানাচ্ছে।চলতি মে মাসে তীব্র গরমের মাঝেই এই নতুন নিয়ম মুসলিমদের উৎসবের আমেজকে ম্লান করে দিয়েছে।
নয়া দিল্লি থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উত্তর প্রদেশের মেরাট জেলার মালিয়ানা গ্রামে এই চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানকার একটি স্থানীয় মসজিদে কমিটির সদস্যরা মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে কঠোর নির্দেশনা জারি করছেন যাতে কেউ কোনোভাবেই মসজিদের গেটের বাইরে বা রাস্তায় নামাজে না দাঁড়ান। কোনো ধরনের বিতর্ক, ভিডিও ধারণ কিংবা উস্কানিমূলক পরিস্থিতির মুখোমুখি না হওয়ার জন্য সাধারণ ধর্মীয় জনতাকে বিশেষভাবে সতর্ক করা হচ্ছে। স্থানীয় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে ইতিমধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সতর্কবার্তা পাঠানো শুরু হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে মালিয়ানা গ্রামটি এমনিতেই অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৭ সালের মে মাসে এই গ্রামে এক ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলায় ৭২ জন মুসলিম নিহত হয়েছিলেন, যার পেছনে স্থানীয় দাঙ্গাবাজ ও প্রাদেশিক সশস্ত্র পুলিশের একাংশের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল। দীর্ঘ ৩৬ বছর আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৩ সালে আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের খালাস দিলেও স্থানীয় মুসলিমদের মন থেকে সেই আতঙ্ক এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি।
বর্তমানে প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের কারণে উৎসবের চেয়ে আইনি জটিলতা ও নিরাপত্তা এড়ানোর বিষয়টি মুসলিমদের কাছে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক স্থানেই ঈদের জামাতের জন্য আগে থেকে পুলিশের লিখিত অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা আগে কখনো প্রয়োজন হতো না। সমালোচকদের মতে, উম্মুক্ত স্থানে নামাজ পড়তে না দেওয়ার এই সরকারি প্রবণতা ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর এক ধরনের পরোক্ষ আঘাত এবং এটি মুসলিমদের সামাজিক অধিকারকে আরও সংকুচিত করছে।
অন্যদিকে কড়া পুলিশি নজরদারি ও সম্ভাব্য আইনি ব্যবস্থার হুমকির মুখে সাধারণ মানুষ কোনো ধরনের তর্কে জড়াতে চাচ্ছেন না। উত্তর প্রদেশের পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও এই ধরনের প্রশাসনিক কড়াকড়ি বাড়ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আসন্ন ঈদের দিনটি ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।
