মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ বুধবার ওয়াশিংটনে তাদের নীতি নির্ধারণী সভায় সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংস্থাটির নতুন প্রধান কেভিন ওয়ারশ নিশ্চিত করেছেন, বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই প্রথম বৈঠকে সুদের হার ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের মধ্যে বজায় রাখার পক্ষে সর্বসম্মত রায় দেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ এবং এর ফলে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পটভূমিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের মধ্যে সুদের হার স্থিতিশীল রাখা নাকি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তা আরও বাড়ানো হবে, তা নিয়ে তীব্র মতভেদ ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে সাবেক ফেডারেল রিজার্ভ প্রধান জেরোম পাওয়েলকে সুদের হার কমানোর জন্য ক্রমাগত চাপ দিয়ে আসছিলেন এবং নতুন প্রধান কেভিন ওয়ারশ দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সেই দাবি পূরণ করবেন বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন। তবে বর্তমান বাজারে মুদ্রাস্ফীতির হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্থাৎ ৩ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছানো এবং ট্রাম্পের যুদ্ধ অবসানের চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির ১২ জন সদস্যই সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে ভোট দেন। এক বিবৃতিতে কমিটি জানিয়েছে যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি শক্তিশালী গতিতে প্রসারিত হচ্ছে। উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি এবং মূলধনী বিনিয়োগের ধারাও বেশ শক্তিশালী রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেছে। মে মাসে ভোক্তা মূল্য সূচক অনুযায়ী মুদ্রাস্ফীতির হার ৪ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে রয়েছে।
কমিটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে এবং বেকারত্বের হারে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বুধবার প্রকাশিত এই নতুন বিবৃতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যোগাযোগ শৈলীতে একটি বড় পরিবর্তন প্রদর্শন করেছে, যা কেভিন ওয়ারশ দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ওয়ারশ অতীতে ফেডারেল রিজার্ভের অতিরিক্ত দীর্ঘ বিবৃতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত কম কথা বলে সরাসরি কাজে মনোনিবেশ করা। এর আগের এপ্রিল মাসের বিবৃতিটি যেখানে প্রায় ৩৫০টি শব্দের ছিল, সেখানে বুধবারের নতুন আপডেটটি মাত্র ১৩২টি শব্দে শেষ করা হয়েছে, যার শেষে লেখা হয়েছে যে কমিটি মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
নতুন এই আপডেট থেকে ভবিষ্যতে সুদের হার আরও কমানোর ইঙ্গিতবাহী পূর্ববর্তী কিছু বক্তব্য সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া ১৮ জন কেন্দ্রীয় ব্যাংকারের মধ্যে ৯ জনই পূর্বাভাস দিয়েছেন যে চলতি বছরেই সুদের হার আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। বিপরীতে মাত্র একজন কর্মকর্তা সুদের হার কমানোর পক্ষে মত দিয়েছেন এবং বাকি ৮ জন মনে করেন যে হার অপরিবর্তিত থাকবে। প্যানথিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিক্সের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ স্যামুয়েল টোম্বস রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন যে এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় খবর হলো বছরের শেষ নাগাদ সুদের হার বৃদ্ধির একটি স্পষ্ট সম্ভাবনা তৈরি হওয়া।
এদিকে ফেডারেল রিজার্ভের এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিছুটা উদাসীনতা প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেছেন যে এটি ঠিক আছে এবং যা হওয়ার তা-ই হবে। তবে সম্ভাব্য সুদের হার বৃদ্ধির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন যে এটি ঘটা কঠিন এবং এটি দেশকে কেবল পিছিয়েই রাখবে। তিনি তার মনোনীত নতুন প্রধান কেভিন ওয়ারশের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বলেন যে সেখানে এখন একজন অত্যন্ত যোগ্য ব্যক্তি রয়েছেন যার সিদ্ধান্তের ওপর তিনি আস্থা রাখছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন শেয়ার বাজারে এই ঘোষণার পর বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে, যা নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের সূচকগুলোতে বড় পতন ডেকে আনে এবং বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগকে স্পষ্ট করে তোলে।
