ইসরায়েলে নির্বাচনী রাজনীতিতে আবারও এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করছে নিরাপত্তা বিতর্ক ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ যুদ্ধের শঙ্কা। দেশটিতে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের সীমান্তপারের ঘটনার তৃতীয় বার্ষিকীর সাথে সরাসরি মিলে যায়। প্রায় তিন বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর সাধারণ ভোটারদের আলোচনায় অর্থনীতি কিংবা অন্যান্য সামাজিক ইস্যু থাকলেও, প্রচারণার কেন্দ্রে অবস্থান করছে যুদ্ধকালীন নীতি এবং পরবর্তী হুমকি মোকাবিলার প্রস্তুতি।
নিরাপত্তার প্রশ্নে ভোটারদের মনস্তত্ত্ব এখনো পুরোপুরি বিভক্ত।
দীর্ঘ এই সময়জুড়ে সামরিক অভিযান ও যুদ্ধের মাত্রা ক্রমে আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছে। গাজা উপত্যকায় টানা আগ্রাসনে ইতোমধ্যে ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সাথে সামরিক বাহিনী ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাথে পাল্টাপাল্টি গোলাবর্ষণ চালিয়েছে, প্রতিবেশী সিরিয়া ও লেবাননের অভ্যন্তরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও নতুন করে ভূখণ্ড দখল করেছে এবং ওয়াশিংটনের সাথে সমন্বয় করে ইরানের ওপর বড় ধরনের দুটি আক্রমণ পরিচালনা করেছে। এত বিস্তৃত সামরিক পদক্ষেপের পরও সাধারণ নাগরিকদের একটি বড় অংশ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম সংশয়ে রয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের সিটি সেন্ট জর্জের রাজনীতি ও সাংবাদিকতার শিক্ষক আয়ালা পানিয়েভস্কি জানিয়েছেন, ইসরায়েলি রাজনীতিতে জাতীয় নিরাপত্তা বরাবরই প্রধান বিবেচ্য বিষয় এবং অন্যান্য সব দাবি এর পেছনে পড়ে থাকে। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলো যখন দ্রব্যমূল্য বা অর্থনৈতিক সংকটকে প্রচারণার সামনে আনার চেষ্টা করেছে, ভোটারদের আচরণে তা তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি।
পানিয়েভস্কির মূল্যায়ন অনুযায়ী, ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহুর অতীতের বড় ধরনের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ভোটাররা এখনো হামাস বা হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ পুনরুত্থান এবং তেহরানের কৌশলগত সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কিত। কোনো ফ্রন্টেই রাজনৈতিকভাবে এমন কোনো মীমাংসা হয়নি যাকে স্থায়ী নিশ্চিন্ততা বলা যায়।
অন্যদিকে কিছু সামরিক কৌশলবিদ মনে করছেন, দৃশ্যত তেল আবিব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কিছুটা কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছে। সিরিয়ায় অভ্যন্তরীণ পটপরিবর্তনে বাশার আল-আসাদ অপসারিত হয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সামরিক পরিকাঠামোয় বড় আঘাত এসেছে এবং গাজায় হামাসের নিয়মিত সামরিক কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইয়েমেনের হুথিরাও লোহিত সাগর উপকূলে তৎপরতা বজায় রাখলেও আঞ্চলিক সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। লন্ডনের কিংস কলেজের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং সামরিক বিশ্লেষক অ্যারন ব্রেগম্যান উল্লেখ করেছেন, বস্তুনিষ্ঠ সামরিক বিচারে তিন বছরের যুদ্ধে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় নিরাপত্তা বলয় বা বাফার জোন তৈরি করে তেল আবিব নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রাচীর কিছুটা সুরক্ষিত করতে পেরেছে।
তবে বাহ্যিক এই সামরিক অগ্রগতির ভেতরেই নিহিত রয়েছে ভিন্ন অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে উগ্র ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের দৌরাত্ম্য এবং প্রতিদিনের সামরিক ধরপাকড়ে সেখানকার সাধারণ ফিলিস্তিনিদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষক ব্রেগম্যান সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিম তীরে চরমপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের উসকানিমূলক আচরণের ওপর প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এই অব্যাহত নিপীড়ন খুব দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ তৃতীয় ফিলিস্তিনি গণঅভ্যুত্থান বা ইন্তিফাদার সূচনা করতে পারে, যা একবার শুরু হলে তা সামরিক শক্তি দিয়ে ঠেকানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আসন্ন নির্বাচনী লড়াইয়ে মূলত এগিয়ে থাকা দুই প্রধান মুখ — বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট — উভয়েই নিজেদের বিজয়ী রূপকার হিসেবে তুলে ধরছেন। একই সাথে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা ভোটারদের সামনে বাইরের শত্রুর অস্তিত্ব ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অপরিহার্যতাকে বারবার প্রধান যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
