পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় পালাবদল ঘটে গেছে। ১৫ বছর একটানা ক্ষমতায় থাকার পর তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্গ পতন হয়েছে এবং ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রথমবারের মতো রাজ্যের ক্ষমতায় আসতে চলেছে। তবে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো এই পরাজয় আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেননি। বিবিসি বাংলা ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার বিকেল চারটায় কালীঘাটে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের অবস্থান পরিষ্কার করার কথা রয়েছে তৃণমূল নেতৃত্বের।
পরাজয় স্বীকার না করলেও, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রায় ১০০টি আসন `লুট` করার যে অভিযোগ তৃণমূল তুলছে, তা মূলত রাজনৈতিক হতাশা থেকেই উঠে আসছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের এমন আকস্মিক বিপর্যয়ের পেছনে মূলত পাঁচটি বড় কারণ চিহ্নিত করা যাচ্ছে।
প্রথম এবং সম্ভবত সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে তৃণমূলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য `নারী ভোটব্যাংক` থেকে। `লক্ষ্মীর ভান্ডার` বা `কন্যাশ্রী`র মতো প্রকল্পগুলো দীর্ঘদিন নারীদের একচেটিয়া ভোট এনে দিয়েছে মমতাকে। কিন্তু এই সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যায় ২০২৪ সালের আরজিকর হাসপাতালের ভয়াবহ ঘটনার পর। কর্তব্যরত চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার পর যে `অভয়া` আন্দোলনের জন্ম হয়, তা রাজ্যের নারীদের মধ্যে নিরাপত্তার চরম অভাববোধ তৈরি করেছিল। প্রথম আলো এবং অন্যান্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই ক্ষোভের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো পানিহাটির মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতে আরজিকরের নির্যাতিতার মায়ের বিপুল ভোটে জয়লাভ। নারীদের এই নীরব বিদ্রোহ তৃণমূলের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
দ্বিতীয় কারণটি কাঠামোগত। নির্বাচন কমিশনের `স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন` বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়। তৃণমূলের অভিযোগ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের বৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, এগুলো মূলত ভুয়া বা মৃত ভোটার ছিল, যা এতদিন তৃণমূলকে অন্যায্য সুবিধা দিয়ে আসছিল। পরিসংখ্যান যা-ই বলুক, এই ব্যাপক সংশোধনের সুফল যে শেষ পর্যন্ত বিজেপির ঘরেই গেছে, তা আসনভিত্তিক ফলাফল থেকে স্পষ্ট।
এখানেই শেষ নয়। ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনে দুর্নীতি, অপশাসন এবং স্থানীয় পর্যায়ে `সিন্ডিকেট রাজ`-এর যে বিস্তার ঘটেছিল, সাধারণ মানুষের মধ্যে তার একটি প্রবল বিরক্তি তৈরি হয়েছিল। বেকারত্ব রাজ্যের অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটের ঠিক আগে যুবকদের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা ভাতার ঘোষণা দেওয়া হলেও, দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থানহীনতার হতাশা তাতে মোছেনি।
মেরুকরণের অঙ্কও এবার তৃণমূলের বিপক্ষে কাজ করেছে। রাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটারের ৮৫-৯০ শতাংশ সমর্থন বরাবরই তৃণমূল পেয়ে এসেছে। কিন্তু এবার এই মুসলিম ভোটের বিপরীতে ব্যাপক হিন্দু ভোটের একত্রীকরণ বা কনসলিডেশন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণে এর আগেও এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। এই মেরুকরণের কারণেই মালদা বা মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিম-গরিষ্ঠ জেলাগুলোতেও বিজেপি অপ্রত্যাশিতভাবে বেশ কয়েকটি আসন ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। মমতার শেষ মুহূর্তের `সফট হিন্দুত্ব` বা মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ সাধারণ হিন্দু ভোটারদের মন গলাতে পারেনি।
সবশেষে বলা যায় নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজিরবিহীন কঠোরতার কথা। রাজ্যের শাসক দল হিসেবে তৃণমূল সাধারণত ভোটের সময় যে প্রশাসনিক সুবিধা পেয়ে থাকে, এবার তা একেবারেই শূন্য ছিল। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই জেলা শাসক ও পুলিশ সুপারদের ব্যাপক রদবদল করে কমিশন। পাশাপাশি, রাজ্যে মোতায়েন করা হয় ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী।
এই নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন, যা আখেরে তৃণমূলের স্থানীয় পেশিশক্তিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে দেয়।যা এখনো অস্পষ্ট তা হলো, তৃণমূল নেতৃত্ব এই বিপুল পরাজয়কে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত যে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।
