পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে আজ শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। এই রাজকীয় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ মুহূর্ত এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অনুষ্ঠান চলাকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ৯৭ বছর বয়সী এক প্রবীণ নেতার পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে দেখা গেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী মোদী কেবল প্রণামই করেননি, বরং সেই প্রবীণ নেতাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে আলিঙ্গনও করেন। এই প্রবীণ ব্যক্তি আর কেউ নন, তিনি হলেন শিলিগুড়ির বাসিন্দা এবং বিজেপির শুরুর দিকের অন্যতম অগ্রজ নেতা মাখন লাল সরকার।
পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির বর্তমান সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই প্রবীণ নেতার পরিচয় ও গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে জানান যে মাখন লাল সরকার ছিলেন ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ১৯৫৩ সালে কাশ্মীরের এক কারাগারে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির রহস্যজনক মৃত্যুর সময় মাখন লাল সরকার তার শেষ সফরের সঙ্গী ছিলেন। আজ পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে প্রথম বিজেপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে এক অনন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। ৯৭ বছর বয়সেও মাখন লাল সরকার যেভাবে হুইলচেয়ারে বসে অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন তা দলের তরুণ কর্মীদের কাছে এক বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
মাখন লাল সরকারের সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের একটি পুরনো ঘটনার কথা উল্লেখ করে শমীক ভট্টাচার্য বলেন যে কংগ্রেস আমলে দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার কারণে দিল্লি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। তৎকালীন সময়ে তাকে আদালতে হাজির করে ক্ষমা চাওয়ার শর্তে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব করা হলেও তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি বিচারককে জানিয়েছিলেন যে দেশাত্মবোধক গান গেয়ে তিনি কোনো অপরাধ করেননি। বিচারক যখন গানটি শুনতে চান তখন তিনি নির্ভীকচিত্তে ভরা আদালতেই সেই গান গেয়ে শোনান। গান শুনে মুগ্ধ হয়ে বিচারক পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তাকে প্রথম শ্রেণির টিকিটে বাড়ি পাঠানো হয় এবং পথের খরচ হিসেবে ১০০ টাকা প্রদান করা হয়।
মাখন লাল সরকারের রাজনৈতিক জীবন মূলত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। তিনি শিলিগুড়ি সাংগঠনিক জেলার প্রথম বিজেপি জেলা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৫২ সালে কাশ্মীরে ভারতীয় তেরঙ্গা উত্তোলন আন্দোলনের সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সঙ্গে থাকার কারণে তাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। ১৯৮০ সালে যখন আজকের বিজেপি গঠিত হয় তখন তিনি পশ্চিম দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলার সাংগঠনিক সমন্বয়কের গুরুদায়িত্ব পান। তার সাংগঠনিক দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় যে মাত্র এক বছরের মধ্যে তিনি প্রায় ১০ হাজার নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
দলীয় প্রথা অনুযায়ী সাধারণত কোনো নেতা একই সাংগঠনিক পদে দুই বছরের বেশি থাকতে পারতেন না তবে মাখন লাল সরকার তার অসামান্য সাফল্যের কারণে ১৯৮১ সাল থেকে টানা সাত বছর জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মঞ্চে উঠেই এই ত্যাগী ও অভিজ্ঞ নেতার পায়ে হাত দিয়ে আশীর্বাদ নেওয়ায় উপস্থিত হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী বাংলার প্রবীণ নেতৃত্ব ও দলের আদর্শিক শেকড়ের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করলেন। শুভেন্দু অধিকারীর এই নতুন যাত্রায় মাখন লাল সরকারের মতো প্রবীণদের আশীর্বাদ বিজেপি শিবিরের জন্য এক বড় মানসিক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
