যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ১০ সপ্তাহব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি সম্ভাব্য চুক্তির দিকে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন আশঙ্কার মেঘ দানা বাঁধছে। এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে ইরান হয়তো শান্ত হবে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও আক্রমণাত্মক কথাবার্তা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের যে ফাটল ধরিয়েছে, তা সহজে মিটবে বলে মনে হচ্ছে না। ইউরোপ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল পর্যন্ত ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যবাহী সহযোগীরা এখন ভাবছেন, ভবিষ্যতের কোনো বৈশ্বিক সংকটে হোয়াইট হাউসের ওপর কি আদৌ আস্থা রাখা সম্ভব? ট্রাম্পের খামখেয়ালি পররাষ্ট্রনীতি কেবল ইরান সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী গড়ে ওঠা বৈশ্বিক শৃঙ্খলাকেই এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ ন্যাটোর ভেতরে এক অভাবনীয় অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আকস্মিক সিদ্ধান্ত বার্লিন ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এক গভীর হিমশীতল সম্পর্কের জন্ম দিয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের একটি মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে পেন্টাগন কেবল সেনা কমাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং জার্মানিতে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত কর্মসূচিও বাতিল করে দিয়েছে। ট্রাম্পের এমন আচরণে ইউরোপীয় নেতারা এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। তারা বুঝতে পারছেন যে আটলান্টিক পারের এই শক্তিশালী বন্ধুটি এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নয়। ট্রাম্প বারে বারে অভিযোগ করছেন যে মিত্র দেশগুলো ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত সমর্থন দেয়নি, অথচ এই যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটে ইউরোপীয় দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চিত্রটিও খুব একটা ভিন্ন নয়। ইরান যখন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ তেল বন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, তখন ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়করভাবে উদাসীন। তিনি এই হামলাকে অত্যন্ত ‘সামান্য’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, যা আমিরাতি প্রশাসনের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আশঙ্কা করছে যে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করতে পারেন যা তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে। ট্রাম্পের এই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি মিত্রদের কেবল দূরেই সরিয়ে দিচ্ছে না, বরং তাদেরকে বাধ্য করছে বিকল্প কোনো শক্তিশালী পক্ষের সন্ধান করতে। এই শূন্যস্থান পূরণে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো এখন ওত পেতে বসে আছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন আধিপত্যকে খর্ব করতে পারে।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েনের মতে ট্রাম্পের বেপরোয়া মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ততাকে এক ঐতিহাসিক ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দোহাই দিয়ে যে হামলা চালানো হয়েছিল, তার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো বিশ্বকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে যে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে তা ইউরোপ ও এশিয়ার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। জাপানের মতো এশীয় দেশগুলো এখন ভাবছে, যদি চীনের সঙ্গে তাইওয়ান নিয়ে কোনো বড় সংঘাত তৈরি হয় তবে ট্রাম্প কি আদৌ তাদের পাশে দাঁড়াবেন? জাপানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকেশি ইওয়ায়ার মতে ট্রাম্পের এই অবজ্ঞা সমগ্র এশীয় অঞ্চলের ওপর একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অন্ধকার ছায়া ফেলতে পারে যা ভবিষ্যতে কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে ইউরোপীয় সরকারগুলো এখন নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তারা ন্যাটোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যৌথভাবে অস্ত্র ব্যবস্থা তৈরির প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। যদিও পরাশক্তিহীন ইউরোপের পক্ষে রাশিয়ার মতো আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে একা রুখে দাঁড়ানো কঠিন, তবুও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। অন্যদিকে চীন এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে একজন নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। ইরান সংকটের ফলে তৈরি হওয়া এই কৌশলগত শূন্যতা চীনকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের এক সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে। ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বমঞ্চে একা করে দেয় কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়।
