একই বিছানায় ঘুমানো স্বামী-স্ত্রী রাতে আলাদা দুটি দেশে অবস্থান করছেন, কিংবা কেবল করের হার কমাতে রাতারাতি বাড়ির সদর দরজাটি কয়েক ফুট সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে—এমন অদ্ভুত সব ঘটনার সাক্ষী বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস সীমান্তের একটি শান্ত শহর। বার্ল নামের এই ছোট্ট শহরটি তার জটিল ভৌগোলিক মানচিত্রের কারণে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এখানকার ফুটপাত, রাস্তা, ক্যাফে, এমনকি মানুষের শোবার ঘরের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে আন্তর্জাতিক সীমান্ত রেখা। রাস্তার ওপর সাদা রঙের ক্রস চিহ্ন দিয়ে এই সীমানা চিহ্নিত করা রয়েছে এবং ল্যাম্পপোস্টগুলোতে ঝুলছে দুই দেশের ছোট ছোট পতাকা, যা পথচারীদের মনে করিয়ে দেয় তারা এই মুহূর্তে ঠিক কোন দেশে দাঁড়িয়ে আছেন।
বাসিন্দারা নিজেদের সুবিধার জন্য শত বছর ধরে এই সীমান্তের ফাঁকফোকরগুলোকে ব্যবহার করছেন।
এই অদ্ভুত ছিটমহল ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়েছিল মধ্যযুগে, যখন স্থানীয় অভিজাত বংশের শাসকরা নিজেদের মধ্যে জমি কেনাবেচা বা বিনিময় করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৮৪৩ সালের `ট্রিটি অব মাশট্রিক্ট` বা মাশট্রিক্ট চুক্তির মাধ্যমে এই সীমানাগুলোকে স্থায়ী জাতীয় সীমান্ত হিসেবে ফ্রিজ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে এই শহরের প্রায় ১০,০০০ বাসিন্দাকে প্রতিদিন দুই দেশের ভিন্ন আইনি ব্যবস্থা, কর কাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নগর পরিকল্পনা নেভিগেট করতে হয়। নেদারল্যান্ডসের অভ্যন্তরে বেলজিয়ামের বেশ কিছু পকেট বা ছিটমহল রয়েছে যা বার্ল-হার্টগ নামে পরিচিত, আবার সেই বেলজিয়ামের ভূখণ্ডের ভেতরেও রয়েছে ডাচ প্রশাসনের ছিটমহল, যা বার্ল-নাসাউ নামে পরিচিত। রাশিয়ান পুতুলের মতো এক দেশের ভেতর অন্য দেশ এভাবে স্তরে স্তরে সাজানো রয়েছে এখানে।
শহরের পর্যটন অফিসের প্রধান উইলেম ভ্যান গুল জানান, বার্লের ইতিহাসে চোরাচালান দীর্ঘকাল ধরে একটি বড় সমস্যা ছিল। অতীতে স্থানীয় কৃষকরা কর ফাঁকি দিতে এবং চড়া দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাতে নিজেদের গবাদিপশু সীমান্ত পার করে প্রতিবেশীর মাঠে রেখে আসতেন। ১৯৬০-এর দশকে একজন চতুর ব্যবসায়ী ঠিক সীমান্তের ওপর একটি ব্যাংক ভবন নির্মাণ করেছিলেন, যাতে কর পরিদর্শকদের চোখ ফাঁকি দিতে এবং অবৈধ অর্থ পাচার করতে এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে নথিপত্র ও তহবিল স্থানান্তর করা যায়। এমনকি কাপড়ের নিচে মাখন লুকিয়ে পাচারের সময় কাস্টমস কর্মকর্তারা সন্দেহভাজন নারীদের আগুনের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখতেন, যাতে মাখন গলে অপরাধ প্রমাণিত হয়।
কর ফাঁকি ও জ্বালানি পর্যটন
১৯৯৩ সালে ইউরোপীয় একক বাজার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর সীমান্ত চৌকি উঠে গেলেও বার্লের বাসিন্দারা এখনও সম্পূর্ণ আইনি উপায়ে এই সীমান্তের অর্থনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন। `ডি বিয়ারগ্রেনস` বা `দ্য বিয়ার বর্ডার` নামের একটি বড় মদের দোকানের মেঝেতে দুই দেশের পতাকার রঙে সীমানা আঁকা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জমি যদি দুই দেশের মধ্যে পড়ে, তবে মেঝের কত বর্গমিটার কোন দেশে রয়েছে সেই অনুপাতে দুই দেশের সরকারকেই লাভের ওপর কর দিতে হয়। ৭০ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা আর্ট ভেরহাগেন জানান, অতীতে মাখন বা চিনি পাচার হলেও এখন পুরো শহর মূলত বিয়ার এবং সস্তা জ্বালানি কিনতে আসা পর্যটকদের দ্বারা পূর্ণ থাকে।
বেলজিয়ামের তরফ থেকে জ্বালানি তেলের ওপর মূল্যসীমা এবং কম শুল্ক থাকার কারণে সেখানে প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম ডাচ অংশের তুলনায় প্রায় ০.৫ ইউরো কম। এর ফলে গাড়ির একটি ফুল ট্যাংক তেল কিনলে বাসিন্দাদের প্রায় ৩০ ইউরো সাশ্রয় হয়। বেলজিয়ামে নিয়ম অনুযায়ী ক্যানে করে ২৪০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি মজুত করা বৈধ হওয়ায় ডাচ চালকরা সুযোগ পেলেই সীমান্ত পার হয়ে বেলজিয়ামের পাম্পগুলোতে ভিড় করেন। তেলের এই দামের পার্থক্যের কারণে বেলজিয়াম অংশের পাম্পগুলোর সামনে প্রতিনিয়ত গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়, যা মাঝে মাঝে পুরো শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাকে স্থবির করে দেয়।
রেডিট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এই অদ্ভুত ভূ-রাজনীতি দেখতে এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসেন। কোভিড মহামারির সময় এই সীমান্ত এক বড় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করেছিল, কারণ প্রথম তরঙ্গের সময় বেলজিয়ামে কঠোর লকডাউন থাকলেও নেদারল্যান্ডসে ছিল শিথিল নিয়ম। মাস্ক ছাড়া ডাচ নাগরিকদের বেলজিয়াম অংশের দোকানে ঘুরে বেড়ানো নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রশাসন উভয় দেশের কঠোরতম নিয়মগুলো যৌথভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং এই অদ্ভুত সমন্বয় দেখতে বিশ্ব মিডিয়ার নজর কাড়ে বার্লের ওপর।
এক শহর, দুই প্রশাসন
ট্যাক্স এবং প্রশাসনিক জটিলতা সাধারণ বাসিন্দাদের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে তা টমাস ও রুথ দম্পতির গল্প থেকে স্পষ্ট হয়। এই ডাচ দম্পতি কাজ করেন নেদারল্যান্ডসে কিন্তু তাদের বাড়িটি পড়েছে বেলজিয়ামের ভূখণ্ডে, যার ফলে তাদের দুই দেশেই কর দিতে হয়। সম্প্রতি তাদের জমজ সন্তান হওয়ার পর কাগজের কাজ সম্পন্ন করতে তাদের কয়েক মাস সময় লেগেছে, কারণ ডাচ পাসপোর্ট তৈরির পর সন্তানদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে সেই নথি আবার বেলজিয়াম সরকারের কাছে জমা দিতে হয়েছে। দুটি টাউন হল, দুটি নির্বাচিত কাউন্সিল, দুটি আলাদা পুলিশ বাহিনী এবং পানি ও বিদ্যুতের জন্য যৌথ কমিটির মাধ্যমে এই পুরো শহরটি পরিচালিত হয়।
বার্ল-হার্টগের বেলজিয়ান মেয়র ফিলিপ লুটস জানান, তাদের টাউন হলের বিয়ের ঘরের মেঝে দিয়েও এই সীমান্ত রেখা অতিক্রম করেছে। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার সময় পাত্র-পাত্রী বা কর্মকর্তাদের অসাবধানতাবশত ডাচ অংশে পা পড়ে গেলে বেলজিয়ান আইন অনুযায়ী সেই বিয়ে বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই শহরে এমন ১৬০টি বাড়ি রয়েছে যার ঠিক মাঝখান দিয়ে সীমান্ত চলে গেছে, যা `লাইন হাউস` নামে পরিচিত। এই বাড়িগুলোর কর নির্ধারণ এবং নাগরিকত্ব নির্ভর করে মূলত বাড়ির সদর দরজাটি কোন দেশের সীমানার ভেতর ওপেন হচ্ছে তার ওপর, যাকে বলা হয় `ফ্রন্ট ডোর রুল`। ১৯৯৫ সালে সীমানা পুনর্নির্ধারণের সময় এক বৃদ্ধার বাড়ি বেলজিয়ামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়লে তাঁর সামাজিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, যা এড়াতে কর্তৃপক্ষ তাঁর বাড়ির সদর দরজাটি মাত্র দুই ফুট বামে সরিয়ে নেদারল্যান্ডসের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়।
