যুক্তরাজ্যে ১ মিলিয়ন বা ১০ লাখ পাউন্ডের একটি বিশাল তহবিল শুনলে সাধারণ মানুষের কাছে জীবন বদলে দেওয়ার মতো একটি অঙ্ক মনে হতে পারে। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অবসরের পর একটি সাধারণ ও আরামদায়ক জীবনযাপনের জন্য এই পরিমাণ অর্থ সঞ্চয় করা অনেকের জন্যই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যের দ্য পেনশনস অ্যান্ড লাইফটাইম সেভিংস অ্যাসোসিয়েশনের (পিএলএসএ) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি দম্পতির সুন্দরভাবে অবসর জীবন কাটানোর জন্য প্রত্যেকের আলাদাভাবে অন্তত ৪ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ডের পেনশন তহবিল থাকা প্রয়োজন।ভবিষ্যতের এই বড় আর্থিক লক্ষ্য অর্জন করা অনেকের জন্যই বেশ কঠিন।
আসলে নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানোর পর নিজের জমানো পেনশন ফান্ড কত বড় হবে তা আগে থেকে নিখুঁতভাবে বলা অসম্ভব। তবে কর্মজীবনের শুরু থেকে প্রতি মাসে সামান্য পরিমাণ বাড়তি টাকা জমা করা কিংবা সঠিক জায়গায় বিনিয়োগের মাধ্যমে ভালো মুনাফা তুলে নেওয়া কয়েক দশক পরে একটি বিশাল ব্যবধান তৈরি করতে পারে। আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, ১ মিলিয়ন পাউন্ডের একটি পেনশন পটের মাধ্যমে অবসরের পর বছরে প্রায় ৮০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত স্থায়ী আয় নিশ্চিত করা সম্ভব। অথবা এককালীন করমুক্ত ২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড তুলে নেওয়ার পাশাপাশি প্রতি বছর ৬০ হাজার পাউন্ড করে নিয়মিত আয় বজায় রাখা যায়। পিএলএসএ মূলত ন্যূনতম, মাঝারি এবং আরামদায়ক — এই তিনটি স্তরের জীবনযাত্রার খরচের হিসাব হিসাব করে থাকে, যেখানে একজন একক ব্যক্তির মাঝারি মানের জীবনযাত্রার জন্য বছরে ৩১ হাজার ৭০০ পাউন্ড প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এজে বেলের অবসর নীতি বিষয়ক প্রধান টম সেলবি মনে করেন, পেনশন মিলিয়নেয়ার হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট একটি ছক সবার জন্য কাজ করবে না। তবে এর মূল চাবিকাঠি হলো কর্মজীবনের শুরুতেই বড় অঙ্কের অবদান রাখা এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে জমার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেওয়া। একই সঙ্গে এই দীর্ঘমেয়াদি টাকা এমন কিছু লাভজনক ফান্ডে বিনিয়োগ করতে হবে যা চক্রবৃদ্ধি মুনাফার পূর্ণ সুবিধা দিতে পারে। ব্রিটিশ পেনশন ব্যবস্থার একটি বড় সুবিধা হলো এর ওপর পাওয়া কর রেয়াত বা ট্যাক্স রিলিফ। একজন উচ্চ আয়ের মানুষ যদি বছরে ৫০ হাজার পাউন্ড আয় করেন এবং দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে প্রতি মাসে ৭০০ পাউন্ড করে তার পেনশন ফান্ডে জমা করেন, তবে ৫ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ধরে সেটি ১ মিলিয়ন পাউন্ডে পৌঁছাতে পারে।
বেশিরভাগ মানুষ তাদের কর্মক্ষেত্রের অফিশিয়াল বা ‘ওয়ার্কপ্লেস পেনশন’ ব্যবস্থার ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করেন। এটি একটি চমৎকার পদ্ধতি কারণ এখানে কর্মীর নিজস্ব জমার পাশাপাশি নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও একটি নির্দিষ্ট অংশ যোগ করা হয়। অটো-এনরোলমেন্ট বা স্বয়ংক্রিয় অন্তর্ভুক্তির অধীনে সর্বনিম্ন মোট জমার হার হলো ৮ শতাংশ, যেখানে প্রতিষ্ঠানের অবদান থাকে অন্তত ৩ শতাংশ। তবে স্বাধীন আর্থিক উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান মেয়ার্নস অ্যান্ড কোম্পানির বিশেষজ্ঞ ম্যালকম স্টিল সতর্ক করে বলেছেন, অনেক সময় এই ওয়ার্কপ্লেস স্কিমগুলো অত্যন্ত রক্ষণশীল বা কম ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ যেমন বন্ডে টাকা বিনিয়োগ করে রাখে। এর ফলে দীর্ঘ ৩০ বছরে স্টক মার্কেটের বড় উত্থানের সুবিধা থেকে কর্মীরা বঞ্চিত হতে পারেন, যা তাদের চূড়ান্ত ফান্ডের আকার ছোট করে দেয়।
নিজের কর্মক্ষেত্রের পেনশনের পাশাপাশি একটি ব্যক্তিগত সেলফ-ইনভেস্টেড পার্সোনাল পেনশন বা এসআইপিপি অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা এই সঞ্চয়কে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশেষ করে যারা ফ্রিল্যান্সার বা আত্মকর্মসংস্থানমূলক পেশায় জড়িত, তাদের জন্য এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত কার্যকর। এটি বিনিয়োগকারীকে নিজের টাকার ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেয়, যার মাধ্যমে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে তার টাকা কোন শেয়ার, ট্রাস্ট বা ফান্ডে খাটানো হবে। ইন্টারঅ্যাক্টিভ ইনভেস্টর নামের একটি ব্রিটিশ ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যাটফর্ম জানিয়েছে, তাদের এসআইপিপি গ্রাহকদের মধ্যে প্রায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ ইতিমধ্যেই মিলিয়নেয়ারে পরিণত হয়েছেন। সব পেনশন ফান্ডকে একটি একক অ্যাকাউন্টের অধীনে নিয়ে আসলে বার্ষিক সার্ভিস চার্জ যেমন কমে যায়, তেমনি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পুরো তহবিলের অগ্রগতি ট্র্যাক করা অনেক সহজ হয়।
