চলতি ২০২৬ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেইজিং সফরের একটি ধারাবাহিক চিত্র চীনের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সচিব ইভেট কুপারের সাম্প্রতিক তিন দিনের চীন সফর এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার সর্বশেষ সংযোজন। বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যান জেংয়ের সাথে বৈঠকের পর তাঁর দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রযুক্তি হাব শেনজেন সফরের কথা রয়েছে, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাকে জোরদার করবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, ইভেট কুপার চলতি বছর চীন সফর করা ২৬তম বিদেশি শীর্ষ প্রতিনিধি, যা বিশ্বমঞ্চে বেইজিংয়ের গ্রহণযোগ্যতার স্পষ্ট প্রমাণ।
বেইজিং এখন বৈশ্বিক রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত বিশ্বের ২৩টি দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, চ্যান্সেলর এবং যুবরাজসহ শীর্ষ নেতারা বেইজিং সফর করেছেন। এর মধ্যে ইউরোপ থেকে ১০ জন, এশিয়া থেকে ৮ জন এবং মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকে ২ জন করে নেতা রয়েছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সফরগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বেইজিং আগমন। বিশেষ করে গত ১৪ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ২০ মে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বেইজিং সফর বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এছাড়া গত ২৫ মে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও চীনের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন।
বিশ্বনেতাদের এই অভূতপূর্ব সফরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজে বিদেশ সফর না করে নিজ দেশে বসেই একের পর এক বিদেশি প্রতিনিধিদের আতিথ্য দিচ্ছেন। অধিকাংশ দেশই চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকার, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ এবং উৎপাদন, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বেইজিংয়ের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই সফরগুলো সম্পন্ন করছে। বিশেষ করে রাশিয়া ও পাকিস্তানের মতো কৌশলগত অংশীদাররা চলতি বছর একাধিক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে নানা মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমা বিশ্ব বেইজিংয়ের সাথে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখতে কতটা আগ্রহী। চীন এখন একাধারে শীর্ষ রপ্তানি বাজার, বিনিয়োগের প্রধান উৎস এবং অন্যতম পরাশক্তি।
চীনের এই কূটনৈতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি। দেশটির জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের মোট পণ্য বাণিজ্য রেকর্ড ৪৫ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা সাড়ে ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার ফলে টানা নবম বছরের মতো বিশ্বের বৃহত্তম পণ্য বাণিজ্যকারী দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে বেইজিং। গত বছরের শেষভাগে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১ ট্রিলিয়ন ডলার স্পর্শ করে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে উৎপাদন হাব হিসেবে চীনের একক আধিপত্যকে প্রমাণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নানা শুল্ক যুদ্ধ সত্ত্বেও ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ৪১৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা চীনের জন্য একক বৃহত্তম বাজার। ভিয়েতনাম, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের সাথেও বেইজিংয়ের বাণিজ্য সম্পর্ক এশিয়ান সাপ্লাই চেইনকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে, যা বিশ্বনেতাদের বেইজিংমুখী হতে বাধ্য করছে।
