মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

আফ্রিকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব ও পর্দার পেছনের মূল্য

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২, ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম

আফ্রিকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব ও পর্দার পেছনের মূল্য

আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার চেনা পথ ছেড়ে আমি যখন আজকের তথাকথিত ‘কনটেন্ট ক্রিয়েশন’ বা আধেয় তৈরির দুনিয়ায় পা রেখেছিলাম, তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল ভীষণ সাধারণ। আমি কেবল আমার ভেতরের শিল্পকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। সেই সময়ে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির আলোকচিত্রীরা পরিচিত হতেন মূলত তাঁদের কাজের ধরন, ছবির বিষয়বস্তু কিংবা বড়জোর তাঁদের ব্যবহৃত ক্যামেরার মডেলের কারণে। কেউ ভাবেনি যে এই মাধ্যমটি একদিন মানুষের আত্মপ্রকাশের এবং উপার্জনের প্রধানতম হাতিয়ার হয়ে উঠবে।ইন্টারনেটের চেয়ে পরিবর্তনশীল আর কোনো কিছু বোধহয় এই পৃথিবীতে নেই।

এক দশক পর আমাদের চেনা সেই দুনিয়াটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আমরা যারা স্রেফ ছবি বা লেখা শেয়ার করতাম, তারা এখন পুরোদস্তুর ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ এবং ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ বা সামাজিক মাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছি। ব্যবসার মডেল বা জনপ্রিয়তার মাপকাঠিও এখন আর আপনার কাজের ওপর নির্ভর করে না; বরং আপনি ব্যক্তি হিসেবে কেমন, কীভাবে পোশাক পরছেন, কীভাবে কথা বলছেন, এমনকি সকালের নাশতায় চা নাকি কফি খাচ্ছেন—সবকিছুই এখন পাবলিক বা প্রকাশ্য। ওম্যাড (দিনে মাত্র একবার আহার) ডায়েট অনুসরণকারীরা সকালে কী খাচ্ছেন, তা দেখতেও এখন লাখো মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আমার সাধারণ জীবনযাত্রাই এখন অন্যের বেঁচে থাকার ধরনকে প্রভাবিত করছে এবং বহুজাতিক ব্র্যান্ডগুলো এই সুযোগটি লুফে নিতে এক মুহূর্তও দেরি করছে না। ২০১৮ সাল থেকে এভাবেই আমি আমার জীবিকা নির্বাহ করছি।

আজকের তরুণ প্রজন্মের, বিশেষ করে মিলেনিয়াল বা তার পরের প্রজন্মের দিন শুরু হয় স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুড়ো আঙুলের ছোঁয়ায়। আফ্রিকা মহাদেশের শহরাঞ্চলগুলোতে যেখানে মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে, সেখানে সকালের প্রথম আলো ফোটার আগেই মানুষ মেতে ওঠে ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। ইনস্টাগ্রাম, এক্স (সাবেক টুইটার), টিকটক আর ফেসবুক এখন মানুষের অবচেতনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন কেনিয়ান ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপ চেক করেন। নাশতা শেষ হওয়ার আগেই তাঁর মগজে ঢুকে যায় দেশ-বিদেশের হাজারো তথ্য—কোনো নিখোঁজ সংবাদ, ধর্মীয় বাণী, মজার মিম, চাকুরির লিংক, রাজনৈতিক আন্দোলনের পোস্টার, কোনো নেতার নামে বানিয়ে দেওয়া ভুয়া উক্তি, টিকটক ড্যান্স চ্যালেঞ্জ কিংবা দিয়ানি সৈকতে কারও বিলাসবহুল ছুটির ছবি।

এই বিপুল তথ্যের প্রবাহ মানুষকে এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ গ্রেসি এনদিয়েগে আল জাজিরাকে জানান, ২০২৬ সালে এসে আমরা যতটা না বাস্তব পৃথিবীতে বাস করছি, তার চেয়ে বেশি বাস করছি আমাদের ফোনের ভেতরে। আমরা কোনো মুহূর্তকে উপভোগ করার চেয়ে তা ক্যামেরাবন্দি করতে বেশি ব্যস্ত থাকি। মনোযোগই এখন আসল মুদ্রা বা কারেন্সি, আর এই মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার জন্যই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এর অ্যালগরিদম প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলে ফেলছে। এই মনোযোগের বাজারকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে কোটি কোটি ডলারের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন শিল্প।

তবে ইন্টারনেটের এই বিস্তার কেবল ব্যক্তিগত বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন আফ্রিকার অন্যতম বড় নাগরিক ও রাজনৈতিক স্পেস বা জনপরিসর। ২০১১ সালের ‘কেনিয়ার্স ফর কেনিয়া’ কর্মসূচির কথা মনে করা যাক, যখন দেশের উত্তরাঞ্চলের তীব্র দুর্ভিক্ষের সময় মানুষ কেবল সহানুভূতি না দেখিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এম-পেসার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা তহবিল সংগ্রহ করেছিল। ২০১৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ আফ্রিকার শিক্ষার্থীরা ‘ফিজ মাস্ট ফল’ (#FeesMustFall) আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অতিরিক্ত ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে পুরো মহাদেশের তরুণদের রাস্তায় নামিয়ে এনেছিল। অতি সম্প্রতি কেনিয়ার প্রস্তাবিত ফাইন্যান্স বিল বা কর বৃদ্ধির বিরুদ্ধে তরুণরা যেভাবে টিকটককে একটি রাজনৈতিক শ্রেণিকক্ষে পরিণত করেছিল, তা বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য নজির। জটিল আইনি ও অর্থনৈতিক ভাষাগুলো সহজ মিম এবং ভিডিওর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।

সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের ভাষাগত সংস্কৃতিকেও দ্রুত বদলে দিচ্ছে।

ইন্টারনেটের এই দ্রুতগতির কারণে উগান্ডার কামপালার একটি ছেলে এখন ঘরে বসেই কানাডার একজন ক্রিয়েটরের কাছ থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের খুঁটিনাটি শিখছে। নাইজেরিয়ার একজন শেফ গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ভেঙে বিশ্বমঞ্চে নিজের নাম লেখাচ্ছেন। প্রতিদিনের কথাবার্তায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন অনলাইন শব্দার্থ। যেকোনো ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে এখন তরুণরা ‘কুকিং’ বা রান্না করা শব্দটা ব্যবহার করছে, তীব্র কোনো মন্তব্যের শেষে ফুল স্টপ দিয়ে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে। যোগাযোগের এই মাধ্যমটি যেমন মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিচ্ছে, তেমনি এর পেছনে এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক মূল্যও চোকাতে হচ্ছে।

পারিবারিক সাইকোথেরাপিস্ট ম্যাগি গিতু এই কৃত্রিম সমাজ নিয়ে এক বড় সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কগুলোকে ভীষণ অগভীর ও সমতল করে ফেলেছে। আমরা অনলাইনে কারও প্রোফাইলে লাইক-কমেন্ট করতে পারছি বলেই কি আমরা তার প্রকৃত বন্ধু? এই প্রশ্নটি এখন প্রতিটি ব্যবহারকারীর নিজেকে করা উচিত। একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে আমি হয়তো লাখো মানুষের একটি তৈরি করেছি, কিন্তু তারা আমার জীবনের কেবল সেই অংশটুকুই দেখতে পায় যা আমি অত্যন্ত যত্ন সহকারে সাজিয়ে গুছিয়ে তাদের সামনে উপস্থাপন করি। পর্দার পেছনের আসল মানুষটাকে তারা কখনোই চিনতে পারে না।

এই অবিরাম ভার্চুয়াল সংযোগ মানুষের মনে তীব্র হীনম্মন্যতা এবং ঈর্ষার জন্ম দিচ্ছে। ইনস্টাগ্রাম যেমন মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস, তেমনি এটি অনেকের কাছে নিজের অপর্যাপ্ততার এক জীবন্ত দলিল। নিজের সমবয়সী কেউ যখন জাঞ্জিবারে ছুটি কাটাচ্ছে, নতুন গাড়ি কিনছে কিংবা সুন্দর সূর্যাস্তের ছবি দিচ্ছে, তখন অজান্তেই নিজের ভেতরের একাকিত্ব ও হতাশা জেগে ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়া হয়তো হিংসা বা হীনম্মন্যতা তৈরি করেনি, কিন্তু এটি প্রতিদিন সেই আগুনকে আরও উস্কে দিচ্ছে। কোনো ক্রিয়েটরই তার ভেঙে যাওয়া সংসার, ভিউ কমে যাওয়ার মানসিক চাপ কিংবা আইডিয়া ফুরিয়ে যাওয়ার তীব্র হাহাকার অনলাইনে প্রকাশ করে না।

এই মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের একটি বাস্তব এবং অফলাইন জীবন থাকা জরুরি। ডেভিড মবোটেলার মতো মানুষ, যিনি একসময় সোশ্যাল মিডিয়ায় অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন, এখন তা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন বাস্তব জীবনের সন্ধানে। ভুয়া তথ্য বা গুজব ছড়াতে আগে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির প্রয়োজন হতো, এখন সেখানে একটি আকর্ষণীয় ক্যাপশন আর ভাইরালে যাওয়ার ক্ষুধাই যথেষ্ট। আমাদের বুঝতে হবে যে অনলাইন সংযোগ মানেই প্রকৃত সামাজিক সৌহার্দ্য নয়। জীবনের কতটা অংশ আমরা অনলাইনে প্রদর্শন করব এবং কতটা নিজেদের জন্য আড়াল করে রাখবো, সেই সীমানা টেনে দেওয়ার সময় এখনই এসেছে।

banner
Link copied!