যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরান যখন নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই দেশটির এক বিশাল অভ্যন্তরীণ সংকট চলমান সামরিক সংঘাতের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বর্তমানে ইরানের পানি সংকট এক নজিরবিহীন ও মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলায় দেশটির উপকূলীয় সুপেয় পানির প্ল্যান্ট, প্রধান পাইপলাইন এবং বেসামরিক পানি অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই ধ্বংসযজ্ঞের কারণে দেশটির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং পরিবেশগত পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।পানির জন্য দেশটির হাহাকার এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।
ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের অ্যাকুয়াডাক্ট ডেটা অনুযায়ী, ইরানের পানি সংকট বর্তমানে `অত্যন্ত উচ্চ` ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে। এর অর্থ হলো, ইরান প্রতি বছর তার মোট নবায়নযোগ্য পানি সম্পদের ৮০ শতাংশেরও বেশি ব্যবহার করে ফেলে, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে দ্রুত খালি করে দিচ্ছে। গত ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ইরান সাম্প্রতিক দশকের সবচেয়ে কঠিন খরা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, যখন দেশের ১৯টি প্রধান বাঁধ সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। তেহরানের প্রধান পানির উৎস আমির কবির বাঁধের পানির স্তর মাত্র ৮ শতাংশে নেমে এসেছিল। সেই সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন যে, ডিসেম্বরের মধ্যে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে পানি রেশনিং করতে হবে, এমনকি রাজধানী তেহরান খালি করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যদিও শেষ পর্যন্ত তেহরান খালি করতে হয়নি, তবে পানির তীব্র ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে গত ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
ইরানের এই পানি সংকটের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি কয়েক দশকের ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ বড় ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে ইরান খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে, যা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে আরও জোরদার করা হয়। এই নীতির অংশ হিসেবে কম বৃষ্টিপাতপ্রвом অঞ্চলেও ধান ও স্টিলের মতো পানি-নিবিড় ফসল ও শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হয়েছে, যা দেশের মোট পানির প্রায় ৯০ শতাংশ গ্রাস করে। উদাহরণ হিসেবে ইসফাহান প্রদেশের জায়ান্দেহ রুদ নদীটি বছরের অধিকাংশ সময় শুকিয়ে থাকে, কারণ এর চারপাশে অতিরিক্ত গভীর নলকূপ খনন এবং পানি-নিবিড় শিল্প স্থাপন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান তার পানি অবকাঠামো আধুনিকীকরণ করার প্রযুক্তি থেকেও বঞ্চিত হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
চলমান যুদ্ধ এই ক্ষতকে আরও গভীর করেছে বলে জানিয়েছেন ইরানের কর্মকর্তারা। গত ৭ মার্চ দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি নিশ্চিত করেন যে, হরমুজ প্রণালীর কেশম দ্বীপে অবস্থিত একটি বড় সুপেয় পানির প্ল্যান্ট মার্কিন বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে প্রায় ৩০টি গ্রামের পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া লাইভসায়েন্সের এক নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ মার্চের মধ্যে যুদ্ধে আবাসন ও অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে প্রায় ৫৬ লাখ টন কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গত হয়েছে, যা আঞ্চলিক জলবায়ুকে আরও উত্তপ্ত করছে। খরা মোকাবিলায় ইরান গত নভেম্বর থেকে কৃত্রিম মেঘ সৃষ্টির মাধ্যমে বৃষ্টিপাত ঘটানোর (ক্লাউড সিডিং) প্রক্রিয়া শুরু করলেও যুদ্ধের কারণে সেই মনোযোগ এখন ব্যাহত হচ্ছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যখন দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে, তখন বড় অঙ্কের বাজেট এই সংকটের সমাধান থেকে অন্য খাতে চলে যাবে, যার ফলে ইরানের পানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
