মঙ্গলবার, ০২ জুন, ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বাঙালির চিরন্তন খাদ্য সংস্কৃতিতে ভর্তার চিরনতুন আবেদন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ২, ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম

বাঙালির চিরন্তন খাদ্য সংস্কৃতিতে ভর্তার চিরনতুন আবেদন

এক থালা ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে সামান্য সরিষার তেল, কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ দিয়ে মাখানো যেকোনো পদের ভর্তা বাঙালির রসনা বিলাসের চিরন্তন অনুষঙ্গ। একসময় যা ছিল গ্রামীণ খেটে খাওয়া মানুষের সহজ ও সস্তা পুষ্টির প্রধান উৎস, তা আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক দরবারেও সমাদৃত। আবহমান বাংলার রন্ধনশিল্পে এই সাধারণ খাবারটি যেভাবে তার নিজস্ব রাজত্ব ধরে রেখেছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। আধুনিক নগরায়ণ এবং পশ্চিমা ফাস্টফুডের আগ্রাসনের যুগেও বাঙালির পাতে ভর্তার কদর বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং এর পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।

খাদ্য সংস্কৃতির এই রূপান্তর এক নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণ তৈরি করেছে।

গ্রামীণ রান্নাঘর থেকে অভিজাত বুফেতে

বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের শহুরে খাদ্য তালিকায় এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। ঢাকার অভিজাত ধানমন্ডি, গুলশান কিংবা বনানীর নামী-দামী রেস্তোরাঁগুলোর বুফে মেন্যুতে এখন আর শুধু চাইনিজ, ইতালিয়ান বা কন্টিনেন্টাল খাবার রাজত্ব করে না। সেখানে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সাজানো থাকে আলু, বেগুন, পটল, ডাল, কালোজিরা, শিম থেকে শুরু করে হরেক রকমের শুঁটকি ও মাছের ভর্তা। মাওয়া ঘাটের পদ্মা সেতুর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা শত শত ভাতের হোটেলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ছুটে যান শুধু গরম ভাত আর ইলিশ মাছের লেজ ভর্তার স্বাদ নিতে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের কাছে এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটি এখন এক ধরণের নস্টালজিয়া এবং আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

রসনা তৃপ্তির পাশাপাশি এই খাবারের বাণিজ্যিক প্রসারও ঘটছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। তরুণ উদ্যোক্তারা এখন শুধু হরেক পদের ভর্তা ও ভাত বিক্রির জন্য বিশেষায়িত রেস্তোরাঁ তৈরি করছেন, যা বেশ লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। শিল-পাটায় বাটা খাঁটি সরিষার তেলের সুবাস শহরের মানুষকে যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। গৃহিণীরাও এখন পারিবারিক কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে বিদেশি ভারী খাবারের বিকল্প হিসেবে দেশীয় এই পদগুলোকে বেছে নিচ্ছেন। মানুষের রুচির এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, শেকড়ের টান সহজে মুছে ফেলা যায় না।

পুষ্টি ও রসনার মেলবন্ধন

পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ভর্তা শুধু স্বাদেই অনন্য নয়, এটি পুষ্টিগুণেও ভরপুর। রান্নার প্রক্রিয়ায় অনেক সময় সবজির ভেতরের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান নষ্ট হয়ে গেলেও হালকা ভাপে বা পুড়িয়ে তৈরি করা ভর্তায় পুষ্টি উপাদান অনেকটাই অক্ষুণ্ন থাকে। যেমন কালোজিরা বা রসুনের ভর্তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শসা, পটল কিংবা চিচিংগার মতো সবজির ভর্তা গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে অত্যন্ত কার্যকরী। এতে ব্যবহৃত সরিষার তেল ও কাঁচা মরিচ হজমপ্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং মুখের রুচি বাড়ায়।

তবে আধুনিক সময়ে এসে এই রন্ধনশৈলীতে কিছুটা নতুনত্ব বা ফিউশনও যুক্ত হয়েছে।

আজকাল স্ট্রবেরি, কাঁচা আম, চালতা কিংবা জলপাইয়ের মতো টক জাতীয় ফলের বৈচিত্র্যময় ভর্তা তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। রাস্তার ধারের ভ্যানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন উপায়ে তৈরি এসব মাখানো বা ভর্তা খাওয়ার জন্য বিকেল হলেই ভিড় জমে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে। তবে এই রূপান্তরের মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ভর্তা তৈরির মূল দর্শন—সবকিছুকে একসাথে হাত দিয়ে চটকে একীভূত করা—তা অপরিবর্তিত রয়েছে। এটি কেবল একটি খাবার নয়, এটি বাঙালি যৌথ পরিবারের মেলবন্ধন ও ভাগাভাগি করে খাওয়ার সংস্কৃতির এক জ্যান্ত প্রতীক। কাঠফাটা রোদ কিংবা বর্ষার স্যাঁতসেঁতে দিন, এক বাটি ভর্তা সব সময়ই বাঙালির প্রিয় আশ্রয়।

banner
Link copied!