যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ কনসার্ট সিরিজ থেকে একের পর এক বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ড দল নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেকে আবার প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন যে, তাঁরা এই মেগা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে কখনোই কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মতি প্রদান করেননি। তবে এতে মোটেও দমে যাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, নিজের প্রচারণায় এদের কাউকেই তাঁর বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই।
নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জোরালোভাবে দাবি করেছেন যে, তিনি এমন তথাকথিত `শিল্পী`দের চান না যারা অতিরিক্ত টাকা নিয়েও খুশি থাকে না, বরং তিনি শুধু সুখী, বুদ্ধিমান, সফল এবং কীভাবে জিততে হয় তা জানা সফল মানুষের পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতে ভালোবাসেন।উদযাপনের মূল মঞ্চ এখন সম্পূর্ণ ট্রাম্প-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।
সংগীতশিল্পীদের এই বয়কটের মুখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রতিনিধিদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন, চলতি জুন মাসের শেষের দিকে ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল মলে পরিকল্পিত ১৬ দিনব্যাপী ‘গ্রেট আমেরিকান স্টেট ফেয়ার’ নামের মহোৎসবে যেন তাঁকেই একমাত্র মূল আকর্ষণ বা প্রধান চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। শিল্পীদের অনুপস্থিতিতে এই মেগা ইভেন্টটি ট্রাম্পের ভাষায় একটি ‘বিশাল মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন র্যালি’তে পরিণত হতে যাচ্ছে যা পুরো উদযাপনে প্রেসিডেন্টের সরাসরি সম্পৃক্ততাকে প্রমাণ করে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ট্রাম্প প্রায়ই বলে আসছেন যে, চার বছরের বিরতির কারণে তিনি এখন এমন এক ঐতিহাসিক সময়ে হোয়াইট হাউসের দায়িত্বে রয়েছেন যখন দেশটিতে বিশ্বকাপ ফুটবল, লস অ্যাঞ্জেলেসে ২০external অলিম্পিক এবং আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের মতো বড় বড় বৈশ্বিক ঘটনা ঘটছে। দেশাত্মবোধে ভরপুর এই লাল-সাদা-নীল রঙের স্বাধীনতা দিবসের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনটির প্রতি প্রেসিডেন্টের বিশেষ ব্যক্তিগত আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
আমেরিকার এই ঐতিহাসিক ২৫০তম বার্ষিকী তদারকির জন্য এক দশক আগে মার্কিন কংগ্রেস একটি অফিশিয়াল কমিশন গঠন করলেও ট্রাম্প-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো নিজস্ব অর্থায়নে `ফ্রিডম ২৫০` নামে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী কমিটি গঠন করেছে। তাদের আয়োজনের তালিকায় রয়েছে ন্যাশনাল মলের স্টেট ফেয়ার, হোয়াইট হাউসের ভেতরে একটি ইউএফসি ফাইট প্রতিযোগিতা, ওরাল্যান্ডোতে শারীরিক কসরত প্রতিযোগিতা, আগস্ট মাসে ওয়াশিংটনের রাস্তায় গ্র্যান্ড প্রিক্স রেস এবং আগামী ৪ জুলাই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আতশবাজি প্রদর্শনী।
ট্রাম্প প্রায়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি নিজের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে এসবের জোরদার প্রচারণা চালাচ্ছেন। এর পাশাপাশি ওয়াশিংটন ডিসির সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পেও হাত দিয়েছেন ট্রাম্প, যার অধীনে লাফায়েত পার্কসহ শহরের এক ডজনেরও বেশি ফোয়ারা এবং লিংকন মেমোরিয়াল ও ওয়াশিংটন মনুমেন্টের মাঝখানের বিখ্যাত রিফ্লেক্টিং পুলটির সংস্কার কাজ চলছে যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। মেমোরিয়াল ব্রিজের কাছে চারটি ব্রোঞ্জের ঘোড়ার মূর্তিতে ২৩ দশমিক ৭৫ ক্যারেট সোনার প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে এবং পোটোম্যাক নদীর ওপর একটি ২৫০ ফুট উঁচু তোরণ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে গত সপ্তাহের মন্ত্রিসভার বৈঠকে ট্রাম্প প্রায় ২০ মিনিট কথা বলেন।
শুধু অবকাঠামোগত সৌন্দর্যবর্ধনই নয়, ট্রাম্পের প্রশাসন এই ঐতিহাসিক উৎসবের সঙ্গে বর্তমান প্রেসিডেন্টকে সরাসরি জড়িয়ে ফেলার নানামুখী আইনি পদক্ষেপও নিচ্ছে। গত মার্চ মাসে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ট্রাম্পের ছবি সংবলিত একটি স্মারক স্বর্ণমুত্রার অনুমোদন দিয়েছে এবং ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট নিশ্চিত করেছেন যে, ট্রাম্পের মুখচ্ছবি সংবলিত একটি বিশেষ ২৫০ ডলারের নোট তৈরির কাজ চলছে, যদিও জীবিত কোনো প্রেসিডেন্টের ছবি নোটে বসাতে কংগ্রেসের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্রেটিক নেতা হাকিম জেফরিস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন যে, ৪ জুলাইয়ের বার্ষিকী কোনো স্বঘোষিত রাজার জন্য নয়, এটি আমেরিকার পথচলাকে উদযাপনের দিন। ডেমোক্র্যাটদের এই সমালোচনাকে ট্রাম্প প্রশাসন `দেশপ্রেমহীনতা` বলে উড়িয়ে দিলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই উদযাপনের কারণে পুরো মার্কিন জাতি এখন আরও বেশি বিভক্ত হয়ে পড়ছে।
