চলতি জ্যৈষ্ঠের তীব্র দাবদাহে পুরো দেশবাসী চরমভাবে হাঁসফাঁস ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। দিন দিন গরমের তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহে তীব্র পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন, ক্লান্তি এবং বিভিন্ন ধরনের জটিল শারীরিক সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই কঠিন সময়ে শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ, সতেজ এবং কর্মক্ষম রাখতে তাজা ফালের রস ও স্বাস্থ্যকর প্রাকৃতিক তরল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতিতেই এমন কিছু ফল ও উপাদান ছড়িয়ে আছে যা তীব্র গরমে পানীয় হিসেবে নিয়মিত গ্রহণ করলে স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে এবং মেদ ও মেটাবলিজম ঠিক থাকে।সঠিক তরল নির্বাচনই পারে গ্রীষ্মের এই খরতাপে শরীরকে চাঙ্গা রাখতে।
এই তালিকায় সবার প্রথমে আসে রসালো ফল তরমুজের শরবত, যা এই সময়ে অত্যন্ত সহজলভ্য এবং মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে দারুণ উপকারী। তরমুজের মধ্যে থাকা শক্তিশালী উপাদান লাইকোপিন সূর্যের প্রখর তাপের কারণে ত্বকের কোষের যে মারাত্মক ক্ষতি হয়, তা থেকে শরীরকে পুরোপুরি রক্ষা করে। এছাড়া এই রসালো ফলের মধ্যে পটাশিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ক্যারোটিনয়েডস, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি৬, ভিটামিন-সি, ক্যালসিয়াম এবং প্রচুর পরিমাণে ডায়েটারি ফাইবার রয়েছে যা শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোকে সচল রাখে। এই ফালের বিশেষ জৈব অ্যাসিড ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, যার ফলে আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। কিডনি ও মূত্রথলিকে সম্পূর্ণ বর্জ্যমুক্ত করতে এই ফলের শরবত অত্যন্ত কার্যকরী এবং এটি তীব্র গরমে পানীয় হিসেবে মুহূর্তের মধ্যে শরীরকে ভেতর থেকে শীতল রাখে। এর পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ফসফরাস সমৃদ্ধ সুস্বাদু আনারসের শরবত দেহের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে তীব্র গরমে দ্রুত স্বস্তি এনে দেয়।
গ্রীষ্মের তীব্র খরতাপে শরীর সতেজ রাখার আরেকটি অনন্য ও চিরায়ত আয়োজন হলো কাঁচা আমের শরবত, যা ভিটামিন সি-তে সম্পূর্ণ ভরপুর। কাঁচা আমের রস তীব্র গরমে শরীর খারাপ লাগা বা ক্লান্তির বিরুদ্ধে চমৎকারভাবে কাজ করে এবং নখের ভঙ্গুরতা রোধসহ ত্বক ও চুলের উজ্জ্বলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। এই আমের শরবতে থাকা পানি, সামান্য লবণ অথবা চিনি আমাদের দেহের হারিয়ে যাওয়া তরল দ্রুত পূরণ করে পানিশূন্যতা সম্পূর্ণ দূর করে এবং ক্ষুধামন্দা কমাতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, ক্লান্তি দূর করতে প্রকৃতির সবচেয়ে খাঁটি ও জাদুকরী উপহার হলো ডাবের পানি, যা পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম এবং ফসফরাসের মতো পাঁচটি প্রধান ইলেকট্রোলাইটের এক অনন্য প্রাকৃতিক উৎস। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, দীর্ঘক্ষণ রোদে কাজ করা বা শরীর দুর্বল হলে ডাবের পানি পান করলে দেহের তরল ভারসাম্য খুব দ্রুত ফিরে আসে এবং এটি তাৎক্ষণিকভাবে কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে। অতিরিক্ত গরমের কারণে শরীরে পানি স্বল্পতা দেখা দিলে অনেকের প্রস্রাবে তীব্র জ্বালাপোড়া বা ইনফেকশন হয়, সেই সময়ে ডাবের পানি শরীর থেকে বিষাক্ত টক্সিন বের করে দিয়ে মূত্রনালি পরিষ্কার রাখে এবং এর উচ্চমাত্রার পটাশিয়াম রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে উচ্চরক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
রসনা বিলাসের এই তালিকায় থাকা শেষ অত্যন্ত কার্যকরী এবং ঐতিহ্যবাহী উপাদানটি হলো বেলের শরবত, যা প্রোটিন, স্নেহ পদার্থ, শর্করা, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ফাইবারের এক অনন্য ভাণ্ডার। গরমের সময় নিয়মিত বেলের শরবত খেলে হিটস্ট্রোকের মারাত্মক ঝুঁকি এক ধাক্কায় অনেক কমে যায় এবং বেলে থাকা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টাল গুণাগুণ ক্যানসার প্রতিরোধক হিসেবে মানবদেহে কাজ করে। এই শরবত শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া সচল ও স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করার পাশাপাশি চোখের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগায়, চোখের সামগ্রিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং লিভার সুস্থ রাখে। বিশেষ করে যারা তীব্র গরমে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের পেট পরিষ্কার রাখতে এবং দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রিক ও অন্ত্রের সমস্যা কমাতে বেলের শরবত নিয়মিত খাওয়া উচিত। বাজারে পাওয়া রাসায়নিকযুক্ত কৃত্রিম কোমল পানীয় সম্পূর্ণ বর্জন করে এই পাঁচটি দেশীয় ও প্রাকৃতিক পানীয় বেছে নিলে তীব্র জ্যৈষ্ঠের খরতাপেও শরীর থাকবে সতেজ, প্রাণবন্ত ও সম্পূর্ণ রোগমুক্ত।
