পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয়ের পর নিজের প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে চরম বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন দলটির সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নাম উল্লেখ না করে তিনি দাবি করেছেন যে, এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পেছনে কার হাত রয়েছে এবং কার কার নাম উঠে এসেছে তা তিনি সম্পূর্ণ জানেন। এই স্পর্শকাতর তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করলে বাংলাদেশ সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে উত্তাল হয়ে উঠবে বলেও মন্তব্য করেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতা-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে ভোটপরবর্তী সহিংসতা, বুলডোজার দিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর এবং হকার উচ্ছেদসহ একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে এক বিশাল ধরণা কর্মসূচিতে বসেন মমতা।এই রাজনৈতিক অবস্থান কর্মসূচি থেকেই তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গন কাঁপানো এই মন্তব্যটি করেন।
ধরণামঞ্চে বক্তব্য রাখার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, ওসমান হাদি হত্যার মূল আসামিদের রাজ্য পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করার পরপরই ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করেছিলেন। সেই ফোনালাপে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি যেন কোনোভাবেই বাইরে জানাজানি না হয় বা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ না পায়, সে বিষয়ে মমতা বাধ্য করেছিলেন কারণ এটি নাকি দেশের অভ্যন্তরীণ ও কূটনৈতিক নিরাপত্তার ব্যাপার ছিল। তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, বাংলাদেশ থেকে একটি বড় খুনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে এবং আমাদের রাজ্য পুলিশের এসটিএফ অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়, যা ছিল রাজ্য পুলিশের এক বিশাল কৃতিত্ব। কিন্তু এর পরপরই অমিত শাহ ফোন করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার অনুরোধ জানান। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে মমতা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন যে, কাকে দিয়ে এই খুনিদের ব্যবহার করানো হয়েছিল এবং তদন্তে কার কার নাম বেরিয়েছিল তা বর্তমান সরকার পরিবর্তন হলেও তাঁর কাছে সমস্ত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন বাংলাদেশের ঢাকা-৮ আসনের একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং দেশের আলোচিত সামাজিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে দুর্বৃত্তরা রিকশায় থাকা হাড়িকে লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি বর্ষণ করে। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে পরিবারের সিদ্ধান্তে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সবশেষ ১৫ ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে ওঠে এবং তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীতে গত ৮ মার্চ হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার অন্যতম সহযোগী আলমগীর হোসেনকে বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ)। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, এতদিন দেশের স্বার্থের কথা চিন্তা করে তিনি এই স্পর্শকাতর তথ্য গোপন রেখেছিলেন, কিন্তু বর্তমান বিজেপি সরকারের অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করায় তিনি আজ মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন। তবে বাংলাদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কারণে তিনি মূল পরিকল্পনাকারীর নাম এই মুহূর্তে জনসমক্ষে বলবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন। এই বিস্ফোরক দাবির পর দুই দেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এখনো এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
