কেনিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে প্রস্তাবিত একটি বিতর্কিত ইবোলা কোয়ারেন্টাইন সেন্টার স্থাপনের চুক্তি ও এর গোপন নথিপত্র জনসমক্ষে প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির হাইকোর্ট। লাইকিপিয়া কাউন্টির নানয়ুকি শহরের একটি বিমান ঘাঁটিতে ৫০ শয্যার এই বিশেষ চিকিৎসা কেন্দ্রটি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দারা তীব্র বিক্ষোভ শুরু করলে পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয় এবং পুলিশের গুলিতে অন্তত দুই আন্দোলনকারী নিহত হন। গত সোমবারের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর স্থানীয় প্রশাসন নানয়ুকি শহরজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।
আদালতের এই নতুন আদেশের পর প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
উচ্চ আদালত সরকারের এই পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে এই প্রকল্পের পরিবেশগত নিরাপত্তা, জৈব-নিরাপত্তা মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং কর্মপরিচালন প্রোটোকল সম্পর্কিত সমস্ত নথি জনসমক্ষে আনার কথা বলা হয়েছে। কাতিবা ইনস্টিটিউট নামক একটি অধিকার সংস্থা এই ইবোলা কোয়ারেন্টাইন সেন্টার স্থাপনের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে মামলাটি dায়ের করে। তাদের দাবি, এই চুক্তিটি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল এবং এর ফলে স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ল সোসাইটি অব কেনিয়া এবং দেশটির প্রধান চিকিৎসক ইউনিয়নও আদালতে এই আইনি পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। এর আগে গত শুক্রবারও হাইকোর্ট এই প্রকল্পের ওপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, যখন প্রথম এই বিষয়টির আইনি চ্যালেঞ্জ সামনে আসে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কেনিয়ার ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতের ওপর এমন বিপজ্জনক ভাইরাসের কেন্দ্র স্থাপন করা হলে তা পুরো অঞ্চলের জন্য মহামারি ডেকে আনতে পারে। মূলত কঙ্গো এবং উগান্ডায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলার বিরল `বুন্দিবুগিও` স্ট্রেনে আক্রান্ত বা ভাইরাসের সংস্পর্শে আসা উপসর্গহীন মার্কিন নাগরিকদের এই কেন্দ্রে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে এই অঞ্চলের ইবোলা পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে, যেখানে এখন পর্যন্ত ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই ইবোলা ভাইরাসের বিস্তার বর্তমানে বৈশ্বিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার চেয়েও দ্রুত গতিতে ছড়াচ্ছে, কারণ এই সংকটের শুরুতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বেশ দেরিতে শুরু হয়েছিল। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই কেনিয়ার নানয়ুকি শহরে সোমবার শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে ব্যারিকেড তৈরি করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনায় প্যাট্রিক ওয়াহোমে নামের একজন সংগঠক দুঃখ প্রকাশ করেন।
তবে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুতো এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী আদেন দুয়ালে এই কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। সরকারের দাবি, এই কেন্দ্রটি জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় প্রস্তুতি এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য অংশীদারিত্বের অংশ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক বিবৃতিতে জানান, এই কেন্দ্রটি কেনিয়ার নিজস্ব জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তৈরি করা হচ্ছিল। কিন্তু আন্দোলনকারী এবং চিকিৎসকদের তীব্র বিরোধিতার মুখে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, সমস্ত প্রাসঙ্গিককাগজপত্র এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে সরকার এই প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে না। ফলে আন্তর্জাতিক এই স্বাস্থ্য চুক্তিটি এখন বড় ধরনের আইনি ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এই মামলার শুনানিতে সরকার কী নথিপত্র পেশ করে, তার ওপরেই নির্ভর করছে পুরো প্রকল্পের ভাগ্য।
