সুদানের রাজধানী খার্তুমের উত্তর অঞ্চলের একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাড়িতে বসে নিজের অবশিষ্ট ইনসুলিনের ডোজগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গণনা করছেন পঞ্চাশোর্ধ ডায়াবেটিস রোগী মুরতাদা মহিউদ্দিন। তার মতো হাজারো সাধারণ মানুষের জন্য জীবন রক্ষাকারী ওষুধ খুঁজে পাওয়ার লড়াইটি এখন কেবল বেঁচে থাকার সংগ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেই ওষুধটি আসল নাকি মেয়াদোত্তীর্ণ বা নষ্ট তা নিশ্চিত করাও এক বড় যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ সুদানের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের কারণে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ওষুধ তৈরির কারখানাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে দেশজুড়ে চিকিৎসা সরবরাহের চেইন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।সুদানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ে শুরু হওয়া এই সুদান যুদ্ধ এ পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং প্রায় ১৪ মিলিয়ন মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ। দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার সুযোগে সেখানে অবৈধ চোরাচালান নেটওয়ার্কগুলো ব্যাপকভাবে ডালপালা মেলেছে। স্থানীয়ভাবে বোকো নামে পরিচিত এই অনিয়ন্ত্রিত ও চোরাচালানি ওষুধে এখন পুরো বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। সীমান্ত পেরিয়ে আসা ম্যালেরিয়ার জীবন রক্ষাকারী ইনজেকশনগুলো পরিবহনের সময় কোনো ধরনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা মান পরীক্ষা করা হয় না। এর ফলে এই ওষুধগুলো প্রায়শই পুরোপুরি নষ্ট ও কার্যকারিতাহীন হয়ে পড়ছে, যা রোগীদের জন্য চরম বিষাক্ত ও প্রাণঘাতী প্রমাণিত হচ্ছে।
খার্তুমের উপকণ্ঠে অবস্থিত ওমদুরমানের স্থানীয় ফার্মেসিগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। রোগীরা এখন কেবল ওষুধের তীব্র স্বল্পতার মুখেই পড়ছেন না, বরং আকাশচুম্বী দাম এবং মানহীনতার কারণে দ্বিমুখী জীবননাশের হুমকিতে রয়েছেন। ওমদুরমানের ফার্মাসিস্ট মুতাওয়াকিল হামজা জানিয়েছেন, এসব অনিয়ন্ত্রিত চোরাচালানি ইনজেকশন সরাসরি রক্তে প্রয়োগের ফলে রোগীদের তীব্র রক্তসংক্রমণ, সিস্টেমিক শক বা আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যেখানে স্থানীয় কারখানাগুলো রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং শিশু সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ওষুধ বিপুল পরিমাণে তৈরি করত, এখন সেই উৎপাদন লাইনের চাকা সম্পূর্ণ স্তব্ধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ পাবলিক হেলথ অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এখন সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যার মধ্যে খার্তুমের ৮৭ শতাংশ এবং উত্তর কর্দোফানের ৮৫ শতাংশ হাসপাতাল পুরোপুরি বন্ধ।
দেশটির সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ন্যাশনাল মেডিকেল সাপ্লাইস ফান্ডের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে মূল সদর দপ্তরের প্রধান গুদামগুলো যুদ্ধের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে সরবরাহ চেইন বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিদেশ থেকে আসা আন্তর্জাতিক সাহায্য পৌঁছাতেও চরম লজিস্টিক বাধা এবং প্রায় ৯০ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। এর ওপর বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়মিতভাবে ফার্মেসিগুলোতে লুটপাট চালাচ্ছে এবং অবশিষ্ট হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সরঞ্জাম ছিনিয়ে নিচ্ছে। গত ২০ মার্চ পূর্ব দারফুরের আল-দাইন টিচিং হাসপাতালে ড্রোন হামলায় চিকিৎসকসহ অন্তত ৬৪ জন নিহত হন এবং ২ এপ্রিল হোয়াইট নীল স্টেটের আল-জাবালিন হাসপাতালে আরেকটি হামলায় হাসপাতালের পরিচালকসহ ১০ জন কর্মী নিহত হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসাস এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, সুদান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম মারাত্মক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার মুখোমুখি এবং এই সংকট একা মোকাবিলা করা দেশটির পক্ষে অসম্ভব।
