গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধ ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ফলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা উপত্যকা পুনর্গঠনে অন্তত ৭১.৪ বিলিয়ন বা ৭,১৪০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে বলে একটি যৌথ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা অক্সফাম, ফিলিস্তিন অর্থনৈতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাস এবং ফিলিস্তিন বাণিজ্য কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিগত দুই দশকে গাজায় পরিচালিত ইসরায়েলি সামরিক হামলাগুলোর পর সম্পন্ন হওয়া মোট পুনর্গঠন খরচের তুলনায় এই পরিমাণ সাত গুণ বেশি। আল জাজিরা ও জাতিসংঘের র্যাপিড ড্যামেজ অ্যান্ড নিডস অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদনের বরাতে এই নিরপেক্ষ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই বছরের যুদ্ধে গাজা উপত্যকায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং এক লাখ ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। এছাড়া মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৯ লাখ মানুষ গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে গাজার সামাজিক ও মানবিক উন্নয়ন অন্তত ৭৭ বছর পিছিয়ে গেছে বলে যৌথ মূল্যায়নে দেখা গেছে। কেবল প্রথম ১৮ মাসের জন্য জরুরি সেবা পুনর্বাসন, অবকাঠামো সংস্কার ও বাজার ব্যবস্থা সচল করতেই প্রয়োজন হবে অন্তত ২৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অক্সফামের তথ্যমতে, গাজায় যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা পুনর্নির্মাণ করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ যা সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতে হবে।
গাজা উপত্যকার সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্রে দেখা যায়, আনুমানিক তিন লাখ ৭১ হাজার ৮৮৮টি আবাসিক বাড়িঘর আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ছয় কোটি ৬০ লাখ টন ধ্বংসস্তূপ সরাতে হবে, যা মিসরের গিজা পিরামিডের ওজনের ১১ গুণের সমান। প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয় যে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আনুমানিক আট হাজার থেকে ১১ হাজার ফিলিস্তিনির মরদেহ চাপা পড়ে রয়েছে, যাদের যথাযথ মর্যাদার সাথে উদ্ধারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এই দীর্ঘ ধ্বংসস্তূপের মাঝে অবিস্ফোরিত বোমা, রাসায়নিক বর্জ্য এবং বিপজ্জনক পদার্থ ছড়িয়ে থাকায় সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ওপর আঘাতের মাত্রা বর্ণনা করে যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার মোট ৯৩ শতাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এছাড়া অর্ধেকেরও বেশি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সুদীর্ঘ যুদ্ধের ফলে গাজার অন্তত ৯২ শতাংশ মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। পুরুষ সদস্য নিহত হওয়ার কারণে অন্তত ৫৮ হাজার ৬০০ পরিবার এখন নারী প্রধান পরিবার হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল নির্বাহী পরিচালক অমিতাভ বেহার বলেন, এর আগের যুদ্ধগুলোর পরও গাজাকে কখনো সঠিকভাবে পুনর্গঠন শেষ করতে দেওয়া হয়নি কারণ ইসরায়েলি অবরোধ পুনর্গঠনের সামগ্রী পৌঁছাতে বাধা দিয়েছে।
গাজা উপত্যকার পুনর্গঠন পরিকল্পনা সফল করতে পাঁচ বছর মেয়াদী একটি চার ধাপের রূপরেখা প্রস্তাব করেছে অক্সফাম ও ফিলিস্তিনি সংস্থাগুলো। প্রথম ধাপে ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে জরুরি ত্রাণ, পানি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য এবং ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, ব্যাংক ও বাজার সচল করার কথা বলা হয়েছে। তৃতীয় ধাপে ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে বৃহৎ অবকাঠামো এবং চতুর্থ ধাপে ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়ন জোরদার করার প্রস্তাব করা হয়। যা কম স্পষ্ট তা হলো বিশ্ব মোড়লরা কেবল আর্থিক প্রতিশ্রুতি দেবেন নাকি ফিলিস্তিনিদের হাতে প্রকৃত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি অর্থায়নে যেকোনো উপরিগত পরিকল্পনা গাজার ওপর নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণ তৈরি করবে যা স্থায়ী কোনো সমাধান আনবে না। ফিলিস্তিনিদের সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ব্যতিরেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোটি কোটি ডলার বরাদ্দও প্রকৃত সাফল্য এনে দিতে পারবে না। ফিলিস্তিন বাণিজ্য কেন্দ্রের গাজা কর্মসূচির ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ স্কাইক স্পষ্ট জানিয়েছেন যে গাজায় যা ধ্বংস হয়েছে তা কেবল ইট-পাথর নয়, বরং কয়েক প্রজন্মের সামাজিক কাঠামো। ফলে সেই কাঠামো কেবল ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বেই নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব।
