দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে ব্যাপক দরপতনের কারণে দেশটির হাজার হাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে বিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিশ্ববাজারে কসপি সূচকটি বিশ্বের অন্যতম অস্থির পুঁজিবাজার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, যেখানে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক ওঠানামা করেছে। রাজধানী সিউলের একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা ইয়ংজুন কিম গত জুলাই মাসে দেশীয় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে দুই কোটি কোরিয়ান ওন বা প্রায় চৌদ্দ হাজার মার্কিন ডলার হারিয়েছেন। এই অর্থ তিনি চলতি বছরের শেষভাগে নিজের বিয়ের পর একটি নতুন বাড়ি কেনার জন্য সঞ্চয় করেছিলেন।
শেয়ারবাজারের এই আকস্মিক ধস কেবল একক কোনো ব্যক্তির ওপর প্রভাব ফেলেনি, বরং গোটা দেশের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয়কে ঝুঁকিতে ফেলেছে। ইয়ংজুন কিম জানান, শেয়ারমূল্য পতনের ফলে তার প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগের মূল্য প্রায় পঁচিশ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং এই ঘাটতি পূরণ করতে তাকে দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হবে। তবে যারা নিজেদের সারা জীবনের সঞ্চয়ের পুরো অংশ এই খাতে বিনিয়োগ করেছিলেন, তারা বর্তমানে আরো বেশি আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মেমোরি চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্সের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগ করা মানুষের অবস্থা এখন সবচেয়ে শোচনীয়।
আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিএনওয়াই-এর বিশ্লেষক উই খুন চং জানান, গত জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে কোরীয় স্টক এক্সচেঞ্জের কসপি সূচকে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম তীব্র দরপতন লক্ষ্য করা গেছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে কসপি সূচকটি দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে জুনের মাঝামাঝি সময়ে নয় হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করেছিল। কিন্তু পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সূচকটি নেমে পাঁচ হাজার পাঁচ শত পয়েন্টে পৌঁছায়, যা করোনা মহামারীর সময়কালীন কিংবা এক হাজার নয় শত সাতানব্বই সালের এশীয় আর্থিক সংকটের তীব্রতার সঙ্গে তুলনীয়। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে সূচকটি বর্তমানে প্রায় ছয় হাজার আট শত পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শেয়ার বিক্রির এই তীব্র হিড়িকের পেছনে মূল কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির উন্নয়নে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর অতিমাত্রায় বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন বৃহৎ প্রতিষ্ঠান চিপ তৈরি ও ডেটা সেন্টারের পেছনে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে, তা থেকে আশানুরূপ বাণিজ্যিক মুনাফা যথাসময়ে ফিরে আসবে কিনা তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সন্দেহ দানা বাঁধছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স খাতের কোম্পানিগুলোর ওপর।
দেশটির আরেক সাধারণ বিনিয়োগকারী উংসা কিম জানান, তিনি তার কর্মস্থলের বাৎসরিক বোনাসের অর্ধেক অর্থ ব্যয় করে বছরের শুরুতে চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্সের শেয়ার কিনেছিলেন। প্রথম কয়েক মাসে সেই শেয়ারের দাম চার গুণ পর্যন্ত বেড়েছিল, তবে সাম্প্রতিক দরপতনে তার অধিকাংশ লাভই বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে তার বিনিয়োগের মোট বাজারমূল্য প্রায় ত্রিশ কোটি ওন, যা সর্বোচ্চ সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হলেও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দা ও প্রযুক্তি খাতের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করে তুলেছে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের এই মূল্য সংশোধন কি দীর্ঘমেয়াদী মন্দার পূর্বাভাস, নাকি এটি নতুন কোনো প্রবৃদ্ধির আগে বাজারের একটি সাময়িক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। সিউলের আর্থিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যেসব সাধারণ মানুষ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কিংবা বাড়ি কেনার জমানো মূলধন দিয়ে শেয়ারবাজারে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের টিকে থাকার পথ এখন অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে এসেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ ব্যয়ের কৌশলের ওপরই এখন নির্ভর করছে কোরীয় শেয়ারবাজারের আগামী গতিপথ।
