বর্তমান সময়ের মা-বাবাদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত শব্দটি হলো `ক্লান্তি`। ইন্টারনেটের বিভিন্ন ফোরাম বা আড্ডায় মা-বাবারা যখন তাদের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন, তখন ঘুরেফিরে একটি বিষয়ই সামনে আসে—হাড়ভাঙা খাটুনি আর চরম অবসাদ। কিন্তু মানবজাতির ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দেয় যে মানুষ তো হাজার হাজার বছর ধরে সন্তান লালন-পালন করছে, তাহলে বর্তমান প্রজন্মের মা-বাবারা কেন আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্লান্ত বোধ করছেন? বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে, এই ক্লান্তির কারণ কেবল ঘুমের অভাব নয়, বরং আধুনিক জীবনযাত্রার গঠনগত পরিবর্তন এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই এর জন্য দায়ী।
প্যারেন্টিং এবং ঘুমের অভাব বর্তমানে সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জার্মানির একটি বৃহৎ গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান জন্মের প্রথম তিন মাসে মায়েরা গড়ে এক ঘণ্টা এবং বাবারা প্রায় ২০ মিনিট কম ঘুমান। অবাক করার মতো বিষয় হলো, সন্তান হওয়ার ছয় বছর পরেও অনেক মা-বাবা তাদের আগের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দে ফিরতে পারেন না। তবে পরিসংখ্যান কিন্তু একটি অন্যরকম গল্প বলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ফ্রান্সের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছরের কম বয়সী শিশুর মা-বাবারা গড়ে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিছানায় থাকেন, যা একজন নিঃসন্তান প্রাপ্তবয়স্কের প্রায় কাছাকাছি। অথচ এই মা-বাবারা শিকার করছেন যে তারা সারাক্ষণ এক ধরনের `বোঝা` বয়ে বেড়াচ্ছেন।
বিবর্তনীয় নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড স্যামসনের মতে, আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে বাস করতেন, তাদের ঘুমের ধরন ছিল অনেক বেশি সামাজিক। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ অ্যান্ড হিউম্যান ইভোলিউশন ল্যাব-এর এই পরিচালক তার `দ্য স্লিপলেস এপ` বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে প্রাচীনকালে মানুষ কখনো একা একা বা কেবল স্বামী-স্ত্রী মিলে সন্তান লালন করত না। তখন পুরো গোষ্ঠী বা সমাজ মিলে একটি শিশুর দায়িত্ব নিত। ফলে রাতে শিশু কাঁদলে বা তাকে খাওয়ানোর প্রয়োজন হলে কেবল মাকেই জেগে থাকতে হতো না। এই `সোশ্যাল স্লিপ` বা সামাজিক ঘুমের ফলে মা-বাবারা নিরাপদ বোধ করতেন এবং তাদের ওপর মানসিক চাপ কম থাকত।
আধুনিক সমাজে এই `গ্রাম` বা গোষ্ঠীগত ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বর্তমানের মা-বাবারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে বাস করেন। এখানে সন্তান দেখাশোনা করার পাশাপাশি অফিস এবং ঘরের সব কাজ নিজেদেরই সামলাতে হয়। গবেষকরা বলছেন, আধুনিক মা-বাবার এই ক্লান্তির বড় একটি অংশ আসে `একাকী লড়াই` করার মানসিকতা থেকে। পূর্বপুরুষদের সময়ে শিশুদের বড় করার জন্য অনেক মানুষের হাত থাকত, যাকে নৃতত্ত্বের ভাষায় বলা হয় `আলোপ্যারেন্টিং`। এখন সেই সহযোগিতার জায়গাটি দখল করেছে গুগল সার্চ বা প্যারেন্টিং অ্যাপ, যা মা-বাবাদের মধ্যে আরও বেশি উদ্বেগ তৈরি করে।
অনিদ্রার চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘুমের গুণগত মান এবং আমাদের প্রত্যাশা। শিল্পোন্নত দেশগুলোতে মা-বাবারা মনে করেন তাদের একটানা অন্তত সাত-আট ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। কিন্তু শিশুদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো রাতে বারবার জেগে ওঠা। যখন বাস্তবতার সাথে আমাদের প্রত্যাশা মেলে না, তখন মস্তিষ্কে এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। শিকারি-সংগ্রাহক সমাজের মা-বাবারা রাতে বারবার জেগে উঠলেও তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেন না, কারণ তাদের কাছে এটাই ছিল স্বাভাবিক। বর্তমান সময়ের কঠোর `স্লিপ শিডিউল` মানার চেষ্টা মা-বাবাদের মধ্যে বাড়তি ক্লান্তি ও ব্যর্থতার বোধ তৈরি করছে।
কর্মক্ষেত্রের চাপ এবং ডিজিটাল ডিভাইসের প্রভাবও এখানে অনস্বীকার্য। দিনের বেলা অফিস সামলে রাতে সন্তানের যত্ন নেওয়া এবং অবশিষ্ট সময়ে স্ক্রিনের সামনে সময় কাটানো আমাদের শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়িকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কৃত্রিম আলো আমাদের মস্তিষ্ককে বার্তা দেয় যে এখনো দিন শেষ হয়নি, ফলে শরীর মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণ করতে পারে না। পূর্বপুরুষদের জন্য রাত ছিল কেবল বিশ্রাম আর গল্পগুজবের সময়, কিন্তু আধুনিক মানুষের জন্য রাত হলো দিনের কাজের বাড়তি অংশ শেষ করার সময়।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে মা-বাবাদের উচিত ঘুমের ঘণ্টার চেয়েও সামাজিক সংযোগের দিকে বেশি নজর দেওয়া। যদি সম্ভব হয় পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা বন্ধুদের সহযোগিতার পরিধি বাড়ানো দরকার। একই সাথে ঘুমের কঠোর নিয়ম নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত না হয়ে শরীরের স্বাভাবিক চাহিদাকে মেনে নেওয়া প্রয়োজন। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে আমাদের শেখার বিষয় হলো, সন্তান পালন কখনো একক দায়িত্ব ছিল না এবং একা করতে গেলেই ক্লান্তি দানা বাঁধবে। ঘুমের এই সংকট আসলে আধুনিক জীবন কাঠামোর একটি উপসর্গ মাত্র।
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের ক্লান্তি কেবল শারীরিক নয়, বরং এটি একটি বিবর্তনীয় শূন্যতার ফল। আমরা এমন একটি যুগে বাস করছি যেখানে সুযোগ-সুবিধা অনেক, কিন্তু মানুষের সাথে মানুষের সেই আদিম আত্মার টান কমে গেছে। মা-বাবারা যদি এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পারেন যে তাদের ক্লান্তি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ব্যবস্থার ত্রুটি, তবে হয়তো তারা মানসিকভাবে কিছুটা হালকা বোধ করবেন। ঘুমের সময় বাড়ানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মনের প্রশান্তি এবং একে অপরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
