গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা তিন হাজার পাঁচ শ ছাড়িয়ে গেছে, যার ফলে এটি বিশ্বের ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাদুর্ভাবে রূপ নিয়েছে। রয়টার্স এবং আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে বর্তমান পরিস্থিতি আগের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। দেশটির যোগাযোগ ও গণমাধ্যম মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন হাজার পাঁচ শ বত্রিশ জনে। এর আগে দুই হাজার আঠারো সাল থেকে দুই হাজার কুড়ি সাল পর্যন্ত চলা প্রাদুর্ভাবকে পেছনে ফেলে বর্তমান সংকট নতুন রূপ নিয়েছে।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ভারপ্রাপ্ত প্রধান কার্ল স্কিউ রয়টার্সকে জানান যে এটি তাদের দেখা সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারী। বিশ্ব সম্প্রদায়কে এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির প্রতি আরও অনেক বেশি মনযোগী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যানুযায়ী এই ভাইরাসে ইতোমধ্যে এক হাজার পাঁচ শ ছাপ্পান্ন জন মারা গেছেন, ফলে মৃত্যুর হার দাঁড়িয়েছে প্রায় চুয়াল্লিশ দশমিক এক শতাংশ। এছাড়া আট শ সাত জন রোগী বর্তমানে আইসোলেশন বা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং ছয় শ ছাব্বিশ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
আফ্রিকার শীর্ষ স্বাস্থ্য সংস্থা আফ্রিকা সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন জানিয়েছে যে প্রাদুর্ভাব শুরুর মাত্র তিন মাসের মধ্যে এটি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী এর আগে কেবল দুই হাজার চৌদ্দ থেকে দুই হাজার ষোলো সাল পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকায় এর চেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল। বর্তমান সংকটের জন্য মূলত ইবোলার বিরল বুন্ডিবাগিও স্ট্রেনকে দায়ী করা হচ্ছে যার জন্য অনুমোদিত কোনো টিকা বা চিকিৎসা এখনও উপলব্ধ নেই।
পূর্ব কঙ্গোর সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার কারণে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাহায্য তহবিলে টান পড়ার কারণে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সহায়তার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় জনগণের মধ্যে কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থার অভাব এবং অসচেতনতা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে। ঐতিহ্যগত ওঝা বা হাতুড়ে চিকিৎসকদের কাছে যাওয়ার প্রবণতা সংক্রমণ শৃঙ্খলকে দীর্ঘায়িত করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চলতি মাসে সতর্ক করে বলেছে যে প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত ব্যাপ্তি সরকারি হিসাবের তুলনায় চার গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হলেও আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। উত্তর কিভু, দক্ষিণ কিভু, ইতুরি, হাতু উেলি এবং তশোপো এই পাঁচটি প্রদেশে এই মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মহল অবিলম্বে বড় ধরনের পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে সীমান্ত অঞ্চলে মানুষের অবাধ যাতায়াত এবং সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা চরম ক্লান্তির মধ্য দিয়ে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা অনেক সময় ফলপ্রসূ হচ্ছে না। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণার কার্যক্রম বাড়ানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক সম্প্রদায় দ্রুত এগিয়ে না আসলে এই মহামারী পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।
