খাবার গ্রহণের পর রক্তে শর্করার মাত্রা সাময়িক বৃদ্ধি পাওয়াকে ক্ষতিকর ভেবে সুস্থ মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। বিভিন্ন মাধ্যমে ডায়াবেটিসমুক্ত ব্যক্তিদেরও দৈনন্দিন শর্করার ওঠানামা নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হলেও গবেষকরা একে স্বাভাবিক বিপাকীয় শারীরবৃত্তির অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। শর্করা ও মিষ্টিজাতীয় খাবার হজমের প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়ে রক্তে প্রবেশ করে। এই সময় অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণ করে সেই গ্লুকোজ শরীরের কোষে পৌঁছে দেয়, যা দেহকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়।
স্বাভাবিক বিপাকপ্রক্রিয়ায় এটি শরীরের এক অতিপ্রয়োজনীয় জৈবিক রূপান্তর।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের শিশু এন্ডোক্রিনোলজিস্ট জেনিফার শের জানান, শুধু খাদ্যগ্রহণই নয়, বরং তীব্র শারীরিক পরিশ্রমের সময়ও যকৃৎ থেকে রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ নির্গত হয়। পেশির তাৎক্ষণিক জ্বালানি হিসেবে এই সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় শর্করার মাত্রা কিছু সময়ের জন্য বেড়ে যায়। সাধারণত খাবার গ্রহণের এক ঘণ্টার মধ্যে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং পরবর্তী দুই ঘণ্টার মধ্যে তা নিজে থেকেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের পুষ্টি ও পথ্যবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান ব্রাউন স্পষ্ট করেছেন, প্রতিটি শর্করার ওঠানামাকে ক্ষতিকর মনে করাই হলো সবচেয়ে বড় ভ্রান্ত ধারণা।
স্বল্পস্থায়ী এই পরিবর্তন স্বাভাবিক হলে চিন্তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তবে রক্তের শর্করা যদি প্রত্যাশিত সময়ের চেয়ে দীর্ঘক্ষণ অস্বাভাবিক উচ্চ থাকে, তবে তা শরীরে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা নির্দেশ করতে পারে। দীর্ঘদিন রক্তে উচ্চমাত্রার শর্করা বজায় থাকলে ইনসুলিন অকার্যকারিতা বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সূচনা হয়, যা পরবর্তীতে প্রিডায়াবেটিস এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসে রূপ নেয়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থেকে স্নায়ু ও চোখের ক্ষতি, হৃদরোগ কিংবা স্ট্রোকের জটিলতা দেখা দেয়। যুক্তরাজ্যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক নিকোলা গেস জানান, অতিরিক্ত গ্লুকোজ সরাসরি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের কারণ কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই, বরং মাত্রাতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ থেকে দেহে মেদ জমা ও ওজন বৃদ্ধিই টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মূল ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত।
ডায়াবেটিস রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অবিচ্ছিন্ন গ্লুকোজ পর্যবেক্ষণ যন্ত্র বা সিজিএম সুস্থ ব্যক্তিদের অপ্রয়োজনীয় খাদ্যসংকোচনে ঠেলে দিচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন। সুস্থ মানুষের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের ৯৬ শতাংশ সময় তাদের রক্তের শর্করা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক মাত্রার ভেতরে থাকে। গবেষকরা সতর্ক করছেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই যন্ত্র রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেখাতে পারে, যা সুস্থ মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
খাদ্যতালিকা থেকে শর্করা সম্পূর্ণ বর্জন করার প্রবণতা উল্টো বিপজ্জনক হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন গবেষক নিকোলা গেস। দীর্ঘ সময় শর্করা বাদ দিয়ে হঠাৎ সেই খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি বৃদ্ধি পায়।
খাবারের সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করে শর্করা শোষণ ধীরগতির করা সম্ভব। সাধারণ সাদা চাল বা পাউরুটির পরিবর্তে লাল চাল ও গোটা শস্যজাতীয় খাবার রক্তে গ্লুকোজ দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল রাখে। কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের আগে প্রোটিন এবং শাকসবজি খাওয়া হলে রক্তে শর্করার দ্রুত উল্লম্ফন প্রতিরোধ করা যায়।
ঘুমের মান, মানসিক চাপ ও শারীরিক তৎপরতার ওপর ভিত্তি করে খাদ্যের প্রতি প্রতিটি মানুষের শারীরিক প্রতিক্রিয়া স্বতন্ত্র রূপ ধারণ করে।
