ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে প্রায় তিন দশক আগে সামরিক হেফাজতে নিখোঁজ হওয়া এক ব্যক্তির মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে সম্প্রতি একটি আদালত ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছে, এএফপি ও আল জাজিরা জানিয়েছে। শ্রীনগরের একটি আদালত গত এপ্রিল মাসে এই আদেশ জারি করে, যা এই অঞ্চলের হাজার হাজার নিখোঁজ মানুষের পরিবারের জন্য এক বিরল আইনি স্বীকৃতি। আদালতের এই রায়ে নিখোঁজ কাঠ ব্যবসায়ী আবদুল রশীদ ওয়ানির একটি ডেথ সার্টিফিকেট বা মৃত্যু সনদ ইস্যু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে পুলিশের দীর্ঘ তদন্তের ওপর ভিত্তি করে আদালত স্বীকার করেছে যে ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে এক ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা ওয়ানিকে অবৈধভাবে হেফাজতে নিয়েছিলেন।
আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে অভিযুক্ত ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন মেজর পদমর্যাদার ছিলেন এবং তিনি আবদুল রশীদ ওয়ানিকে নিজের হেফাজতে রেখে হত্যা করেন এবং পরে তার মরদেহ গায়েব করে দেন। ঘটনার দিন ওয়ানি শ্রীনগরে তাঁর নিজের বাড়ির কাছে কাঠ সরবরাহকারীদের টাকা পরিশোধ করার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সন্ধ্যায় তাঁর স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য সেজেগুজে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু ওয়ানি আর কোনোদিন ফিরে আসেননি এবং দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে পরিবারটি তাঁর সন্ধানে আদালতের দরজায় দরজায় ঘুরেছে। ওয়ানির ছেলে জুনায়েদ রশীদ, যিনি তাঁর বাবার নিখোঁজ হওয়ার সময় মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পা দিয়েছিলেন, এখন ৩৪ বছর বয়সে এসে এই আইনি লড়াইয়ে কিছুটা সান্ত্বনা পেয়েছেন।
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই রায়ের ফলে কাশ্মীরে নিখোঁজ হওয়া হাজার হাজার অন্যান্য ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং আইনি সুরাহা পাওয়ার পথ কতটা সুগম হবে। কাশ্মীরে গত কয়েক দশকের সশস্ত্র সংঘাতের সময় হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন যাদের ভাগ্য সম্পর্কে তাদের পরিবার এখনো পুরোপুরি অন্ধকারে রয়েছে। এই নিখোঁজ পুরুষদের স্ত্রীদের কাশ্মীরে হাফ-উইডো বা অর্ধ-বিধবা বলা হয়, যারা তাদের স্বামীদের জীবিত বা মৃত কোনো অবস্থার কথা নিশ্চিতভাবে না জানায় পূর্ণাঙ্গভাবে শোক প্রকাশ করতে পারেন না। ভুক্তভোগী পরিবারটি জানিয়েছে যে এই স্বীকৃতি যদি আরও আগে আসত তবে হয়তো তাদের জীবন এবং তাদের মায়ের স্বাস্থ্য অন্যরকম হতে পারত।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিখোঁজ হওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় আট হাজার। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং তাদের মতে নিখোঁজদের অনেকেই সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। তবে এই মামলার ক্ষেত্রে পুলিশের নিজস্ব তদন্তেই এক সেনা কর্মকর্তার জড়িত থাকার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আদালত ওয়ানির মৃত্যুর তারিখ হিসেবে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার দিনটিকেই রেকর্ড করেছে, তবে তাঁর মরদেহ কোথায় সমাহিত বা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
দীর্ঘ ২৯ বছর পর সরকারের এই আদালতের মাধ্যমে নৃশংসতা স্বীকার করাকে এই অঞ্চলের মানবাধিকার আন্দোলনের একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। জুনায়েদ রশীদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে তারা বছরের পর বছর ধরে যে কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছেন তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ এখনো তাদের প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার বা অন্তত তাদের শেষ পরিণতির কথা জানার আশায় দিন গুনছেন। কাশ্মীরের এই রায় ভবিষ্যৎ আইনি লড়াইয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে বলে ধারণা করছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।
