অস্ট্রেলিয়ার একজন মুসলিম সেনেটরের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মন্তব্য করার দায়ে অভিযুক্ত উগ্র ডানপন্থী নেত্রী পলিন হ্যানসনের আপিল আবেদন সর্বসম্মতভাবে খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির ফেডারেল আদালত, রয়টার্স ও আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। সোমবার সিডনিতে তিন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত ফুল ফেডারেল কোর্টের বিচারক বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে দুই হাজার চব্বিশ সালে দেওয়া আগের রায়টি সম্পূর্ণ আইনি ও সঠিক ছিল। উগ্র অভিবাসনবিরোধী ওয়ান নেশন পার্টির নেত্রী পলিন হ্যানসনের করা মন্তব্যটি আইনত অবৈধ ছিল এবং বাকস্বাধীনতার অজুহাতে একে সুরক্ষা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এই মামলার সূত্রপাত ঘটেছিল দুই হাজার বাইশ সালের সেপ্টেম্বরে যখন ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর গ্রিনস পার্টির ডেপুটি লিডার মেহরিন ফারুকী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা পোস্ট করেছিলেন। মেহরিন ফারুকী লিখেছিলেন যে তিনি এমন এক সাম্রাজ্যের প্রধানের জন্য শোক প্রকাশ করতে পারেন না যা উপনিবেশের মানুষের জীবন, জমি ও সম্পদ লুণ্ঠনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। এর জবাবে পলিন হ্যানসন তাকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পাকিস্তান থেকে আসা প্রকৌশলী মেহরিন ফারুকী অস্ট্রেলিয়ার প্রথম মুসলিম নারী সেনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এই আক্রমণের পর তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন।
দুই হাজার চব্বিশ সালে মামলার প্রাথমিক রায়ে আদালত রায় দিয়েছিলেন যে হ্যানসনের বক্তব্যটি মারাত্মকভাবে অপমানজনক, অবমাননাকর এবং ভয়প্রদর্শনমূলক ছিল যা অস্ট্রেলিয়ার বর্ণবৈষম্য আইনের আঠারো সি ধারা লঙ্ঘন করেছে। পলিন হ্যানসন সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে দাবি করেছিলেন যে তার বক্তব্য বর্ণবাদী ছিল না এবং এটি রাজনৈতিক আলোচনার অংশ ছিল। তবে আপিল বেঞ্চের বিচারক মেলিসা পেরি, জেফরি ক্যানেট এবং এলিজাবেথ বেনেট আপিলের সাতটি যুক্তির প্রতিটিই খারিজ করে দেন। বিচারকরা মন্তব্য করেন যে হ্যানসনের বক্তব্যটি অস্ট্রেলিয়ায় নতুন করে আসা অভিবাসী এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি সুপরিচিত বর্ণবাদী স্লোগানের শামিল ছিল।
আদালতের সিদ্ধান্তের পর সিডনিতে আদালতের বাইরে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন সেনেটর মেহরিন ফারুকী। তিনি বলেন যে আজ সত্য ও ন্যায়বিচারের জয় হয়েছে এবং এই জয় হলো সেই প্রতিটি মানুষের জন্য যাদের কখনো না কখনো নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কথা বলে অপমান করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে ঘৃণামূলক বক্তব্য কখনো বাকস্বাধীনতা হতে পারে না এবং আদালত সেই সত্যকে পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বর্ণবৈষম্য কমিশনারও আদালতের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন যে এটি দেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজকে রক্ষা করতে বড় ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে একটি বিবৃতি জারি করেছেন রাজনৈতিক দল ওয়ান নেশন প্রধান পলিন হ্যানসন। তিনি দাবি করেছেন যে অস্ট্রেলিয়ার মুক্তচিন্তা ও মুক্ত আলোচনা এমন কিছু আইনি ব্যবস্থার কারণে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে যা সাধারণ মানুষকে ভয় পাইয়ে দেয়। তবে যা কম স্পষ্ট তা হলো, তিনি দেশটির সর্বোচ্চ বিচারালয় হাই কোর্টে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নতুন করে আপিল করবেন কিনা। হ্যানসনের আইনি দল পরবর্তী দিনগুলোতে রায়ের নথি পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছে।
ইসলামোফোবিয়া ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার বিচার ব্যবস্থার এই অবস্থানকে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখছে। বিচার বিভাগ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে মুক্ত রাজনৈতিক যোগাযোগের নামে কাউকেও জাতি, ধর্ম বা বর্ণের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগতভাবে অপমান করার সুযোগ নেই। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘৃণা ছড়ানো রাজনীতিবিদদের জন্য একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
