মানুষের জীবনে এমন কিছু কঠিন মুহূর্ত আসে যখন চারপাশের সব চেনা পথ আচমকা বন্ধ মনে হয়। মানুষের নিজস্ব সামর্থ্য, জাগতিক সম্পর্ক, পূর্বের অভিজ্ঞতা কিংবা যুক্তি কোনো কিছুই তখন আশার আলো দেখাতে পারে না। ঠিক সেই চরম অসহায়ত্বের জায়গাতেই ইসলাম মানুষকে এক বিস্ময়কর ও অলৌকিক শক্তির পথ দেখিয়েছে, যার নাম দোয়া। দোয়া কেবল কিছু চেনা শব্দ মুখে উচ্চারণের নাম নয়, বরং এটি হলো রবের সামনে নিজের পরম অক্ষমতার স্বীকৃতি, আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থার প্রকাশ এবং ভাগ্যের অন্ধকারে আলো খোঁজার এক নিরন্তর আধ্যাত্মিক সংগ্রাম।পবিত্র কোরআন ও হাদিসে দোয়াকে এমন এক অনন্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে যা মুসলিম জীবনের মূল চালিকাশক্তি।
স্বয়ং মহান আল্লাহ সুরা গাফিরের ৬০ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। এই পবিত্র বাণীতে দয়াময় প্রভু মানুষকে শুধু দোয়ার অনুমতিই দেননি, বরং সরাসরি নিজের কাছে চাওয়ার জন্য পরম মমতায় আহ্বান জানিয়েছেন। আল্লাহর এই ডাক বান্দার জন্য এক বিশাল সৌভাগ্য, যেখানে তিনি নিজেই মানুষের সমস্ত অভাব ও দুঃখ দূর করার দায়িত্ব নিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুনানে তিরমিজির ২৯৬৯ নম্বর হাদিসে এর গুরুত্ব স্পষ্ট করে বলেছেন যে, দোয়াই হলো মূল ইবাদত। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি তার জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম গ্রন্থে লিখেছেন, দোয়ার ভেতর বান্দার বিনয়, আশা, ভয়, ভালোবাসা এবং সর্বান্তকরণে আল্লাহর ওপর নির্ভরতার এক পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা ঈমানের গভীরতাকে প্রমাণ করে।
নিয়মিত আল্লাহর দরবারে হাত তোলার মাধ্যমে মানুষের মন থেকে ধীরে ধীরে সমস্ত অহংকার ও অহমিকা দূর হয়ে যায়। দোয়ার অভ্যাস মানুষের অন্তরে ধৈর্য, গভীর ভরসা এবং একটি ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করে যা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের গবেষকদেরও বিস্মিত করেছে। সমকালীন চিকিৎসা বিজ্ঞানের বহু গবেষণায় দেখা গেছে, একাগ্র চিত্তে প্রার্থনা মানুষের মানসিক উদ্বেগ ও অবসাদ কমাতে এবং জীবনের তীব্র হতাশা মোকাবিলা করতে অনন্য শক্তি জোগায়। পবিত্র কোরআনে নবীদের জীবনে দোয়া করার মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করার অসংখ্য জীবন্ত উদাহরণ রয়েছে। যেমন হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম যখন তিমি মাছের পেটের নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে বন্দি ছিলেন, তখন সব মানবিক উপায় শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি সুরা আম্বিয়ার ৮৭ নম্বর আয়াতে বর্ণিত বিখ্যাত দোয়াটি করেছিলেন যে, আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। আল্লাহ তার সেই আকুল ডাকে সাড়া দিয়ে তাকে জঠরের বন্দিদশা ও চরম দুঃখ-কষ্ট থেকে অলৌকিকভাবে মুক্তি দিয়েছিলেন।
বিখ্যাত মনীযী ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তার আদ-দা ওয়াদ-দাওয়া গ্রন্থে দোয়ার প্রভাব সম্পর্কে লিখেছেন যে, দোয়া পৃথিবীতে নেমে আসা যেকোনো কঠিন বিপদ-আপদ প্রতিরোধ করে, সমস্যার তীব্রতাকে হালকা করে এবং অনেক সময় তা সম্পূর্ণ দূর করে দেয়। অধিকাংশ মানুষ দোয়াকে কেবল বিপদের মুহূর্তের সাথে সম্পর্কিত করে দেখে, অথচ ইসলাম আমাদের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের সময়েও আল্লাহকে স্মরণ করার তাগিদ দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, স্বচ্ছল অবস্থায় তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো, তবে তিনি তোমাদের কঠিন সময়ে বিশেষভাবে স্মরণ করবেন। আজকের এই তীব্র যান্ত্রিক ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ পৃথিবীতে মানুষ প্রযুক্তিগতভাবে যত উন্নত হচ্ছে, মানসিকভাবে তত বেশি অস্থির, একাকী ও হতাশ হয়ে পড়ছে। এই আত্মিক শূন্যতা দূর করার একমাত্র কার্যকর মাধ্যম হলো আসমানের মালিকের সাথে সম্পর্ক গভীর করা।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব বলতেন যে, তিনি নিজের দোয়া কবুল হওয়া নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নন, বরং তিনি দোয়া করার তাওফিক বা সুযোগ পাওয়া নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভাবেন। কারণ যখন কোনো বান্দাকে দোয়া করার সৌভাগ্য দেওয়া হয়, তখন তার জন্য আল্লাহর রহমত ও কবুলিয়তের দরজাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসনাদে আহমাদের ১১১৩৩ নম্বর হাদিসে মুমিনদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, কোনো মুসলিম যখন আল্লাহর কাছে দোয়া করে, তখন আল্লাহ তাকে তিনটি ফলের যেকোনো একটি অবশ্যই দান করেন। হয় তাৎক্ষণিকভাবে তার সেই দোয়া কবুল করা হয়, অথবা তা আখিরাতের বড় পুণ্য হিসেবে সঞ্চয় করে রাখা হয়, কিংবা তার সমপরিমাণ কোনো বড় দুনিয়াবি বিপদ দূর করে দেওয়া হয়। তাই তাহাজ্জুদের নীরব রাতে আল্লাহর দরবারে ফেলা এক ফোঁটা অশ্রু মানুষের বহু বছরের অন্ধকার জীবনকে মুহূর্তের মধ্যে আলোয় আলোকিত করে দিতে পারে।
