বুধবার, ০৩ জুন, ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মোগল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন রাজশাহীর বাগধানী শাহী মসজিদ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৩, ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

মোগল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন রাজশাহীর বাগধানী শাহী মসজিদ

can বাংলার প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ইসলামি স্থাপত্যকলার এক গৌরবোজ্জ্বল ও অনন্য নিদর্শন হিসেবে যুগের পর যুগ টিকে রয়েছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বাগধানী শাহী জামে মসজিদ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনাটি কেবল একটি সাধারণ উপাসনালয়ই নয়, বরং এই অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের এক অনন্য জীবন্ত দলিল। রাজশাহী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার অন্তর্গত বাগধানী কাচারীপাড়ায় এই ঐতিহাসিক মসজিদের অবস্থান। একসময় যে অঞ্চলটি বারনই নদীর অববাহিকায় জমিদারি শাসন ও ব্যস্ত নৌবাণিজ্যের মূল কেন্দ্র ছিল, সেখানে আজ মোগল আমলের এই অনন্য কীর্তি অতীতের জৌলুস নিয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।মসজিদটি ১৭০১ খ্রিষ্টাব্দে মোগল আমলের শেষভাগে নির্মিত হয়েছিল।

নওহাটা ডিগ্রি কলেজ মোড়ের অদূরে অবস্থিত এই মসজিদটি প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো আঞ্চলিক ইতিহাসের অবিনশ্বর স্মারক বহন করছে। সরকারি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঐতিহাসিক নথিপত্র এবং মসজিদের প্রধান প্রবেশদ্বারে খোদাইকৃত ফারসি শিলালিপি থেকে এর নির্মাণকাল ও নির্মাতা সম্পর্কে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। শিলালিপি অনুযায়ী, মুন্সি মুহাম্মাদ ইনায়াতুল্লাহ নামের এক ধনাঢ্য ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব এই সুদৃশ্য তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন সময়ে বারনই নদীই ছিল এই অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। মসজিদের ঠিক পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত এই নদীর তীরে একসময় একটি ব্যস্ত নৌঘাট এবং পবা অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যবাহী হাট বসত। সপ্তাহে দুই দিন, বিশেষ করে প্রতি শুক্র ও মঙ্গলবার বসা এই হাটে দূর-দূরান্ত থেকে বড় বড় বাণিজ্যের বজরা নৌকা এসে ভিড়ত। মসজিদের পাশেই অবস্থিত প্রাচীন জমিদার কাচারি ঘরের ধ্বংসাবশেষ আজও প্রমাণ করে যে, এই স্থানটি একসময় জমিদারি প্রশাসনিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর এই ঐতিহাসিক সমজিদটি প্রায় ৩ হাজার ২০০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এর মূল কাঠামোর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ ফুট এবং প্রস্থ ৪০ ফুট, যার চার কোণায় সুদৃশ্য নকশাখচিত গম্বুজাকৃতির পিলার বা কোণার মিনার রয়েছে। মসজিদের উপরিভাগে মোগল স্থাপত্যের চিরচেনা অবয়বে তিনটি বড় গম্বুজ অত্যন্ত নিখুঁত ও নিপুণতার সাথে স্থাপন করা হয়েছে। এর ভেতরের ও বাইরের দেওয়ালে প্রাচীন চিনা মাটির চমৎকার কারুকাজ ও আকর্ষণীয় লতাপাতার নকশা রয়েছে, যা যেকোনো সাধারণ দর্শনার্থী ও গবেষককে অনায়াসে মুগ্ধ করে। মূল মসজিদের ভেতরে তিনটি প্রাচীন মেহরাব ও প্রবেশদ্বারের চমৎকার জ্যামিতিক বিন্যাসে একসঙ্গে প্রায় ৮৭ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন, যদিও বর্তমান সময়ে স্থানীয় মুসল্লিদের সুবিধার্থে ঐতিহাসিক মূল অবয়ব ঠিক রেখেই সামনের অংশটি বেশ কিছুটা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

তবে দীর্ঘ সময়ের অবহেলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই প্রাচীন স্থাপত্যের অনেক মূল্যবান নিদর্শন ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। বিশেষ করে ১৯৯০ সালের এক শক্তিশালী ও ভয়াবহ ভূমিকম্পে পুরো মসজিদটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে দেওয়ালের ভেতরের অনেক আদি অলংকরণ চিরতরে হারিয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিশেষ উদ্যোগে কিছু জরুরি সংস্কার কাজ করা হলেও প্রাচীন কাচারি ঘরের ধ্বংসাবশেষ ও দেয়ালের ঐতিহাসিক মোজাইকগুলো এখনো চরম অরক্ষিত অবস্থায় রয়ে গেছে। রাজশাহীর এই অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি পর্যায়ে বড় ধরনের স্থায়ী সংরক্ষণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক তত্ত্বাবধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি, যা একে আগামী প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে বাঁচিয়ে রাখবে।

banner
Link copied!