মুসলিম নারীদের পর্দা ও সঠিক হিজাব পরিধানের ক্ষেত্রে কিছু প্রচলিত ভুলত্রুটি এবং এর শরয়ি সমাধান নিয়ে উম্মাহ কণ্ঠ রবিবার ঢাকায় এক বিশেষ পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আধুনিক যুগে অনেক নারী বোরকা বা হিজাব পরিধান করলেও ইসলামের মূল নির্দেশনা অনুযায়ী পর্দার প্রকৃত উদ্দেশ্য অনেক সময় ব্যাহত হয়। ইসলামে পর্দা কেবল একটি বাহ্যিক পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি মানুষের সামগ্রিক আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনযাপনের এক অনন্য প্রতিফলন। ধর্মীয় গবেষকদের মতে সঠিক নিয়মে পর্দা না করার কারণে নারীরা অজান্তেই আধ্যাত্মিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
পর্দা পালনের প্রথম ও প্রধান ভুলটি হলো অতিরিক্ত আকর্ষণ সৃষ্টিকারী এবং জমকালো নকশার বোরকা পরিধান করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যে মুমিন নারীরা যেন সাধারণত প্রকাশমান সৌন্দর্য ছাড়া তাদের অন্য কোনো সাজসজ্জা পরপুরুষের সামনে প্রকাশ না করে (সূরা আল-নূর, ২৪:৩১)। বর্তমান বাজারে বিভিন্ন ধরণের ঝলমলে পাথর, ভারী কারুকাজ এবং অতিরিক্ত দৃষ্টিকাড়া রঙের বোরকা ও হিজাব পাওয়া যায় যা খুব সহজেই মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে। তাফসিরবিদ ও ইসলামিক স্কলারদের মতে যে পোশাক নিজেই এক ধরণের প্রদর্শনীর বস্তুতে পরিণত হয় তা পর্দার মূল আধ্যাত্মিক চেতনাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
দ্বিতীয় বড় ভুলটি হলো শরীরের গঠন স্পষ্টকারী আঁটসাঁট বা অত্যন্ত পাতলা কাপড়ের হিজাব ও বোরকা ব্যবহার করা। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে দুই শ্রেণির জাহান্নামি মানুষ রয়েছে যাদের তিনি এখনো দেখেননি এবং তাদের মধ্যে এক শ্রেণি হলো এমন নারী যারা পোশাক পরিধান করেও মূলত উলঙ্গ থাকে (সহীহ মুসলিম, ২১২৮)। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেছেন যে অতিরিক্ত টাইট বা পাতলা পোশাক যা দিয়ে ভেতরের অঙ্গ বা অবয়ব দেখা যায় তা এই কঠোর সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত। অতএব একজন মুসলিম নারীর পোশাক অবশ্যই এমন ঢিলেঢালা হওয়া উচিত যা তার শারীরিক গঠনকে পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে রাখে।
তৃতীয়ত অনেক নারী বোরকা ও হিজাব পরার পরেও বাইরে যাওয়ার সময় তীব্র সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবহার করেন যা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে কোনো নারী যখন সুগন্ধি লাগিয়ে জনসমক্ষে যাতায়াত করে যাতে লোকেরা তার সুঘ্রাণ পায় তখন সে অত্যন্ত অনৈতিক কাজ করে (সূনান আবু দাউদ, ৪১৭৩)। এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজকে যেকোনো ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত আকর্ষণ এবং অনৈতিকতা থেকে মুক্ত রাখা। বাইরে বের হওয়ার সময় নারীদের এমন সুগন্ধি পরিহার করা উচিত যা গায়রে মাহরাম বা পরপুরুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।
চতুর্থ প্রচলিত ভুলটি হলো হিজাবের ভেতরে মাথার চুল অত্যন্ত উঁচু করে বাঁধা যা দেখতে উটের কুঁজের মতো মনে হয়। সমসাময়িক সময়ে তরুণীদের মাঝে হিজাবের নিচে বড় খোপা বা কৃত্রিম জিনিস ব্যবহার করে চুল উঁচু করার একটি ভুল প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সহীহ মুসলিমের এক দীর্ঘ বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ধরণের নারীদের নিন্দা করে বলেছেন যে তাদের মাথা হবে উটের হেলানো কুঁজের মতো এবং তারা জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না (সহীহ মুসলিম, ২১২৮)। ইসলামিক আইনবিদরা মনে করেন যে মাথার চুলকে কৃত্রিমভাবে উঁচু করে প্রদর্শন করা হিজাবের মূল সৌন্দর্য ও শালীনতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং এটি এক ধরণের প্রচ্ছন্ন অহংকার প্রকাশ করে।
পঞ্চম ভুলটি হলো বাহ্যিকভাবে পোশাক ঠিক রাখলেও গায়রে মাহরাম বা পরপুরুষের সাথে কথাবার্তা ও আচরণে ridicu শিথিলতা প্রদর্শন করা। ইসলামে পর্দা কেবল পোশাকের কাপড়ে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি কণ্ঠস্বরের শালীনতার সাথেও যুক্ত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন যে তোমরা পরপুরুষের সাথে কথাবার্তায় অতিরিক্ত কোমলতা অবলম্বন করো না যাতে অন্তরে ব্যাধি থাকা কোনো ব্যক্তি প্রলুব্ধ হতে পারে (সূরা আল-আহজাব, ৩৩:৩২)। সুতরাং কর্মক্ষেত্রে বা সামাজিক প্রয়োজনে কোনো পরপুরুষের সাথে কথা বলার সময় অপ্রয়োজনীয় হাসি-ঠাট্টা, অতিরিক্ত কোমলতা বা অঙ্গভঙ্গি পরিহার করে অত্যন্ত গম্ভীর ও সংক্ষিপ্তভাবে কথা বলা জরুরি।
যা কম স্পষ্ট তা হলো পশ্চিমা আধুনিক সংস্কৃতির প্রভাবে বর্তমান মুসলিম সমাজে পর্দার এই বাহ্যিক রূপটি টিকিয়ে রাখা গেলেও এর ভেতরের নৈতিক চেতনা কতটা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে মুমিন নারীদের প্রথমে তাদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করতে বলেছেন (সূরা আল-নূর, ২৪:৩১)। একই আয়াতে আরও বলা হয়েছে যে তারা যেন মাটিতে এমনভাবে পদবিক্ষেপ না করে যাতে তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশ পেয়ে যায়। এর অর্থ হলো পথ চলার সময় ধীরস্থিরতা বজায় রাখা এবং এমন আচরণ না করা যা মানুষের কৌতূহল বা দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পর্দা হলো একজন নারীর আত্মমর্যাদার প্রতীক এবং তার চলাফেরায় সেই গাম্ভীর্য প্রকাশ পাওয়া বাঞ্ছনীয়।
সপ্তম এবং অত্যন্ত সমসাময়িক ভুলটি হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বোরকা বা হিজাব পরে নিজের ছবি ও ব্যক্তিগত জীবন প্রদর্শন করা। অনেক নারী বাস্তব জীবনে কঠোরভাবে পর্দা বজায় রাখলেও ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো অনলাইন মাধ্যমে নিজের হিজাব পরা সুন্দর ছবি, রিলস বা সাজসজ্জা প্রকাশ করে থাকেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে লজ্জা হলো ঈমানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ (সহীহ আল-বুখারী, ৯)। অনলাইন জগতে নিজের ছবি প্রদর্শন করা পর্দার মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ পরপুরুষের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল রাখার বিধানকে সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে। তাই একজন মুমিন নারীর উচিত বাস্তব জীবনের মতো ভার্চুয়াল বুদ্বুদেও ইসলামের লজ্জাশীলতার নীতি কঠোরভাবে মেনে চলা।
পর্দা কেবল একটি tradition বা সামাজিক রীতি নয় বরং এটি মহান আল্লাহর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাধ্যতামূলক বিধান যা সরাসরি নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে সম্পৃক্ত। ইসলাম নারীদের যে পর্দার রূপরেখা দিয়েছে তা সমাজে শান্তি, পবিত্রতা এবং নৈতিকতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী। বোরকা ও হিজাব পরিধানের পাশাপাশি মুসলিম নারীদের উচিত তাদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান, কথাবার্তা এবং সামাজিক যোগাযোগের প্রতিটি স্তরে ধর্মীয় অনুশাসন বজায় রাখা। কোরআন ও সুন্নাহর এই নিখুঁত নির্দেশনাগুলো মেনে চললে হিজাব কেবল একটি পোশাক থাকবে না sondern এটি আল্লাহর দরবারে একটি মহান ইবাদত হিসেবে কবুল হবে যা ইহকাল ও পরকালে মুমিন নারীর জন্য পরম কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে গণ্য হবে।
