রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

আরবের মরুর বুকে নারীর প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল ইসলাম

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৪, ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম

আরবের মরুর বুকে নারীর প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল ইসলাম

মানবসভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে আরবের বুকে ইসলামের আবির্ভাব নারীর অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা সুরক্ষায় এক নজিরবিহীন বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল বলে রবিবার রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে ধর্মীয় গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, উম্মাহ কণ্ঠ ডেস্ক জানিয়েছে। প্রাচীন পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজ ও সামন্ততান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় যখন নারীরা চরমভাবে উত্তরাধিকারবঞ্চিত, সামাজিক অধিকারহীন এবং কেবল পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ইচ্ছার অধীনস্থ এক ক্রীড়নক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন, তখন ইসলাম প্রথম একক আদেশ হিসেবে নারীর অস্তিত্বকে মানুষের পূর্ণ মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। আরবের জাহেলী সমাজের সেই অন্ধকার যুগে কন্যাসন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো জঘন্য ও অমানুষিক প্রথা চালু ছিল যা তৎকালীন সভ্যতার এক চরম নৈতিক অবক্ষয়কে ফুটিয়ে তোলে। এই অমানুষিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইসলাম কোনো রাজনৈতিক স্লোগান বা নিছক সাময়িক সামাজিক আন্দোলনের ভাষা ব্যবহার না করে মানুষের মৌলিক পরিচয়কে সম্পূর্ণ নতুনভাবে পুনর্নিমাণ করে।

ইসলামের মূল শিক্ষা অনুযায়ী কোনো মানুষ কেবল তার লিঙ্গ বা দৈহিক কাঠামোর কারণে সমাজে মর্যাদাবান বা অবহেলিত হতে পারে না, Taxonomy বা প্রতিটি মানুষের মূল মূল্যায়নের ভিত্তি হলো তার মানবত্ব ও নৈতিক চরিত্র। আরবের তপ্ত মরুভূমিতে এই ধারণাটি যেমন সম্পূর্ণ নতুন ছিল, তেমনি মানবসভ্যতার বৃহত্তর ইতিহাসেও এটি ছিল এক অসাধারণ ও যুগান্তকারী বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির সাধারণ শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে গিয়ে বলেন যে নিশ্চয়ই আমি আদমসন্তানকে মর্যাদাবান করেছি (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৭০)। এই ঐশ্বরিক বাণীতে মর্যাদার ভিত্তি হিসেবে নারী বা পুরুষকে আলাদা না করে সামগ্রিকভাবে মানুষকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে যা ইসলামের নারী দর্শনের মূল শিকড়কে নির্দেশ করে। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে নারীর অধিকার কোনো দয়া বা করুণার দান নয়, বরং এটি তার জন্মগত ও স্রষ্টাপ্রদত্ত প্রকৃত অধিকার।

আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও ইসলাম নারী ও পুরুষকে সম্পূর্ণ সমান অবস্থানে উন্নীত করেছে যা প্রাচীন কোনো ধর্ম বা সমাজ ব্যবস্থায় ভাবা অসম্ভব ছিল। সূরা আল-আহজাবের এক বিশেষ আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী এবং ইবাদতকারী পুরুষ ও ইবাদতকারী নারীদের জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন (সূরা আল-আহজাব, ৩৩:৩৫)। এই আয়াতের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয় যে আল্লাহর কাছে মানুষের চূড়ান্ত মূল্যায়ন তার লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়, বরং তার ঈমান, তাকওয়া, ব্যক্তিগত চরিত্র এবং সৎ আমলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। ইসলাম নারীকে কোনো শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি থেকে করুণা করেনি, তার যথামর্যাদার পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়ে সমাজে এক সম্মানিত আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

কন্যাসন্তানের প্রতি আরবের জাহেলী সমাজের যে চরম নিষ্ঠুর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, পবিত্র কুরআনের আয়াত মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়ে সেই মানসিকতাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা সূরা আত-তাকভীরে অত্যন্ত গম্ভীর ভাষায় প্রশ্ন তুলেছেন যে যখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল (সূরা আত-তাকভীর, ৮১:৮-৯)। মানুষের চিন্তাভাবনা ও সমাজ পরিবর্তন করার জন্য কখনো কখনো একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে এবং ইসলামের এই একটি প্রশ্ন আরবের বুকে কন্যাকন্যাশিশুদের জন্য এক নতুন ভোরের সূচনা করেছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কন্যাসন্তানের সঠিক লালন-পালন, ভালোবাসা এবং তাদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করাকে পরকালের মুক্তির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা তৎকালীন আরবে এক নীরব ও গভীর সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়েছিল।

পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে মায়ের কোল হলো সন্তানের প্রথম ও সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং ইসলাম এই প্রাকৃতিক সম্পর্ককে এক সর্বোচ্চ সম্মানজনক মর্যাদা দান করেছে। একদা এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তার উত্তম ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে, তখন আল্লাহর নবী উত্তর দিয়েছিলেন যে তোমার মা (সহীহ আল-বুখারী, ৫৯৭১)। সেই ব্যক্তি যখন দ্বিতীয় এবং তৃতীয়বারও একই প্রশ্ন করেন, আল্লাহর রাসুল প্রতিবারই মায়ের কথা উল্লেখ করেন এবং চতুর্থবার বাবার নাম বলেন। এই হাদিসটি কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি একটি সভ্যতার সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে যার অর্থ হলো যে জাতি মাকে সম্মান করতে শেখে না, সে জাতি কখনো তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিকভাবে গড়ে তুলতে পারে না।

জ্ঞানের জগতকে ইসলাম কখনো কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে কল্পনা করেনি, বরং শিক্ষা অর্জনকে প্রতিটি মুসলিমের জন্য একটি সার্বজনীন বাধ্যবাধকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পবিত্র কুরআনের প্রথম বাণীই ছিল যে পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন (সূরা আল-আলাক, ৯৬:১)। এই মহান আহ্বান কোনো বিশেষ পুরুষ বা নারীর জন্য আলাদা ছিল না, বরং তা ছিল সমগ্র মানবজাতির জন্য এক সাধারণ নির্দেশ যার ফলে ইসলামের ইতিহাসে অসংখ্য নারী জ্ঞানের ধারক, বাহক ও শিক্ষক হিসেবে অনন্য অবদান রেখেছেন। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে জ্ঞানচর্চার প্রতিটি অঙ্গন নারী ও পুরুষের যৌথ পদচারণায় সমৃদ্ধ ছিল এবং ইসলাম নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী বা অধীনস্থ কোনো ছায়া না বানিয়ে সমাজের এক সম্মানিত সহযাত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো আধুনিক যুগের পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা নারী অধিকারের নামে বাহ্যিক স্বাধীনতার কথা বললেও নারীর ভেতরের প্রকৃত মানবিক সম্মান ও আত্মিক পবিত্রতা কতখানি রক্ষা করতে পারছে। বর্তমান বিশ্বজুড়ে নারী অধিকার নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান ও নতুন নতুন তাত্ত্বিক আলোচনা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীকে একটি বাণিজ্যিক পণ্যের মতো ব্যবহার করার এক প্রচ্ছন্ন প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এর বিপরীতে চৌদ্দশত বছর আগে আরবের মরুভূমিতে ইসলাম যে অধিকারের রূপরেখা দিয়েছিল তা নারীর নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করেছিল। পবিত্র কুরআনে পারস্পরিক সম্পর্কের ভাষা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের সহযোগী ও বন্ধু (সূরা আত-তাওবা, ৯:৭১)।

পারিবারিক জীবনের স্থায়িত্ব ও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মধুর সম্পর্কের ব্যাখ্যায় পবিত্র কুরআনে এক অপূর্ব শৈল্পিক উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাকারায় বলেছেন যে তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৭)। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্ক আধিপত্যের নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, গোপনীয়তা রক্ষা এবং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে জীবনযাপন করার এক অনন্য অংশীদারত্ব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নিজের পারিবারিক জীবনের আচরণের মাধ্যমে এই আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিয়ে বলেছেন যে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম (জামে আত-তিরমিযী, ৩৮৯৫)।

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবনের শেষ ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণেও উপস্থিত লাখো সাহাবির সামনে নারীদের অধিকার রক্ষা ও তাদের সাথে উত্তম আচরণ করার জন্য বিশেষ তাগিদ দিয়েছিলেন (সহীহ মুসলিম, ১২১৮)। তিনি সমাজকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে নারীদের অধিকারের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো কারণ তোমরা তাদের আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ। এই বক্তব্যগুলোকে কেবল নিছক পারিবারিক নীতিকথা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, এগুলো হলো একটি সভ্যতার নৈতিকতার পরিমাপক কারণ যে সমাজ তার নারীদের প্রকৃত সম্মান দিতে পারে না, সে সমাজ কখনো সভ্য হতে পারে না। অতএব আরবের মরুর বুকে ইসলামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নারী অধিকারের সেই শাশ্বত সোনালী ব্যবস্থাপনাই মানবজাতির মুক্তির একমাত্র সঠিক পথ।

banner
Link copied!