পাপ বা গুনাহ করার পর অনুতপ্ত না হয়ে অহংকার ও অবাধ্যতার মাধ্যমে বিদ্রোহী হওয়া মানবাত্মার জন্য চরম ধ্বংসাত্মক বলে ঢাকা থেকে রবিবার এক বিশেষ ইসলামিক পর্যালোচনায় জানিয়েছে উম্মাহ কণ্ঠ ডেস্ক। সৃষ্টিগতভাবে মানুষ মাত্রই ভুল ও পাপের মুখোমুখি হতে পারে তবে একজন প্রকৃত মুমিনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো সে নিজের ভুল বুঝতে পারা মাত্রই মহান আল্লাহর দরবারে অনুতপ্ত হয় এবং নিজেকে সংশোধনের আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু সমসাময়িক সমাজ জীবনে কিছু মানুষ পাপ করার পর বিন্দুমাত্র অনুশোচনা প্রকাশ করে না বরং যারা তাকে সত্যের পথে আহ্বান করে ও ভুলের সমালোচনা করে তাদেরই শত্রু মনে করে অপমান ও নানা ধরণের হুমকি দেয়। ইসলামিক গবেষক ও বিশিষ্ট আলেম মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজার মতে এই ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত মানসিকতা চরম অহংকার, হৃদয়ের কঠোরতা এবং সত্য প্রত্যাখ্যানের মতো মারাত্মক আত্মিক ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ যা মানুষকে হেদায়েত থেকে বহু দূরে ঠেলে দেয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা এই ধরণের অহংকারী ও একগুঁয়ে স্বভাবের মানুষের কঠোর সমালোচনা করে তাদের ভয়াবহ পরিণতির কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। সূরা আল-বাকারার এক বিশেষ আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন যে যখন কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর ভয় অর্জন করার এবং নিজের ভুল সংশোধন করার কথা বলা হয় তখন তার ভেতরের মিথ্যা অহংকার তাকে আরও বড় গুনাহ ও পাপাচারের দিকে প্রলুব্ধ করে যার কারণে তার জন্য জাহান্নামের জঘন্য আবাসই নির্ধারিত হয়ে যায় (সূরা আল-বাকারা, ২:২০৬)। এই আয়াত থেকে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে নিজের ভুলকে স্বীকার না করে উল্টো গোঁড়ামি প্রদর্শন করা মানুষের আধ্যাত্মিক ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে। ইতিহাসে শয়তানের পতনের মূল কারণও ছিল এই অবাধ্যতা ও তীব্র অহংকার যা তাকে চিরকালের জন্য অভিশপ্ত ও কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত করেছিল (সূরা আল-বাকারা, ২:৩৪)।
যা কম স্পষ্ট তা হলো আধুনিক যুগের মুসলিম সমাজে এই সুপ্ত অহংকার ও উপদেশদাতাকে অবমূল্যায়ন করার প্রবণতা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনগুলোকে ভেতরে ভেতরে কতটা মারাত্মকভাবে কলুষিত করে তুলছে। বর্তমান সময়ে মানুষ যখন কোনো ধর্মীয় বা নৈতিক ভুলের সম্মুখীন হয় তখন তারা গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করার বিনয় হারিয়ে ফেলে এবং নিজেদের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করতে নানা ধরণের ভ্রান্ত যুক্তির আশ্রয় নেয়। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলোর ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে দেখা যায় যে আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসুলরা যখনই তাদের সত্যের দাওয়াত দিয়েছেন তখনই ফিরাউন, নুহ আলাইহিস সালামের জাতি এবং শুআইব আলাইহিস সালামের জাতি সত্য গ্রহণ না করে উল্টো আল্লাহর মনোনীত বান্দাদের হত্যা বা দেশান্তরের হুমকি দিয়েছিল (সূরা ত্বহা, ২০:৭১)। সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এমন অহংকার প্রদর্শন করা মূলত একটি প্রাচীন শয়তানি স্বভাব যা মানুষের অন্তরকে চিরতরে সিলগালা করে দেয়।
ইসলামিক আইনবিদ ও গবেষকদের মতে বারবার গুনাহ করার পর অনুতপ্ত না হয়ে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার অপচেষ্টা মানুষের অন্তরে এক ধরণের স্থায়ী ব্যাধি তৈরি করে যা তাকে সত্য দেখার ক্ষমতা থেকে সম্পূর্ণ অন্ধ করে ফেলে। সূরা আল-বাকারার দশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে তাদের অন্তরে এক ধরণের মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি রয়েছে যার ফলে আল্লাহ তাদের সেই ব্যাধিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তাদের মিথ্যাচারের কারণে তাদের জন্য রয়েছে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি (সূরা আল-বাকারা, ২:১০)। একজন প্রকৃত মুসলিমের মূল कर्तव्य হলো নিজের যেকোনো ছোট-বড় ভুলের জন্য অবিলম্বে তাওবা করা এবং সত্যকে গ্রহণ করার মতো বিনম্র মানসিকতা নিজের ভেতরে লালন করা। মহান আল্লাহ তাআলা সর্বদা তার দরবারে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসা তওবাকারীদের ভালোবাসেন কিন্তু যেকোনো ধরণের অহংকারী, অত্যাচারী ও সীমা লঙ্ঘনকারীকে তিনি মোটেও পছন্দ করেন না যা মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের একমাত্র ধ্রুব সত্য।
