রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বাহ্যিক রূপ ও ধন-সম্পদ কখনো মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি নয়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৪, ২০২৬, ০৯:২১ পিএম

বাহ্যিক রূপ ও ধন-সম্পদ কখনো মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি নয়

মানুষের বাহ্যিক পোশাক, ধন-সম্পদ কিংবা সামাজিক পদ-পদবি কখনোই ইসলামে মানুষের প্রকৃত মর্যাদার মানদণ্ড হতে পারে না বলে রবিবার ঢাকার এক বিশেষ পর্যালোচনা সভায় বিশিষ্ট গবেষকরা জানিয়েছেন, উম্মাহ কণ্ঠ ডেস্ক নিশ্চিত করেছে। আমাদের বর্তমান আধুনিক সমাজে প্রতিনিয়ত মানুষকে তার বাহ্যিক চাকচিক্য, দামি পোশাক-পরিচ্ছদ কিংবা উচ্চ পদমর্যাদা দিয়ে বিচার করার একটি ক্ষতিকারক সামাজিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেকোনো সাধারণ আচার-অনুষ্ঠান, সরকারি বা বেসরকারি সেবাগ্রহণ কিংবা সাধারণ কেনাকাটা করতে গেলে সেখানে ধনবান ও বিত্তশালীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় যা সামাজিক সাম্যের পরিপন্থী। ইসলাম মানুষকে এই বাহ্যিক চাকচিক্য দিয়ে বিচার করার সংকীর্ণ মানসিকতাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহ করেছে এবং মানবমর্যাদার এক শাশ্বত ভিত্তি নির্ধারণ করে দিয়েছে।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতির সৃষ্টির রহস্য এবং তাদের পারস্পরিক মর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা সুরা হুজুরাতের তেরো নম্বর আয়াতে উল্লেখ করেছেন যে হে মানুষ, আমি তোমাদের এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার (সুরা হুজুরাত, ৪৯:১৩)। এই আয়াতে মহান স্রষ্টা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন। এই ঐশ্বরিক ঘোষণা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে মানুষের প্রকৃত মর্যাদার মানদণ্ড হলো তার ভেতরের খোদাভীতি বা তাকওয়া, কোনো পার্থিব ধন-সম্পদ বা বাহ্যিক রূপ-সৌন্দর্য নয়।

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণেও এই বর্ণবাদ ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। মুসনাদে আহমদে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে হে লোক সকল, শোনো, তোমাদের প্রতিপালক এক এবং তোমাদের পিতা এক। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন যে কোনো আরবির ওপর অনারবির এবং অনারবির ওপর আরবির, কোনো কৃষ্ণকায়ের ওপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের ওপর কৃষ্ণকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। আল্লাহর রাসুলের এই বাণী প্রমাণ করে যে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও সামাজিক মর্যাদা কেবল তাকওয়ার কারণে নির্ধারিত হতে পারে যা মানবজাতিকে সব ধরণের কৃত্রিম বৈষম্য থেকে মুক্তি দেয়।

বর্তমান যুগের সমাজে প্রায়শই দেখা যায় যে দামি ব্র্যান্ডের পোশাক, বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা উচ্চ সামাজিক অবস্থান থাকলে মানুষকে বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়। অথচ একজন অত্যন্ত সৎ, নীতিবান এবং আল্লাহভীরু কিন্তু সাধারণ পোশাক পরিহিত মানুষকে সমাজে তেমন কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্রও দেখা যায় যেখানে কেবল ধর্মীয় পোশাক বা দ্বীনি পরিচয়ের কারণে কাউকে অবমূল্যায়ন করা হয়। কেউ সুন্নতি টুপি, পাঞ্জাবি, দাড়ি রাখা কিংবা শরয়ি পর্দা মেনে চললে আধুনিকতার দাবিদার একাংশ তাকে অযোগ্য বা আধুনিকতা বিরোধী মনে করে থাকে। অথচ বাস্তবে সেই অবহেলিত ব্যক্তিটি হয়তো অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত, বড় কোনো পদমর্যাদার অধিকারী কিংবা সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।

মানুষকে কেবল বাহ্যিক স্টাইল বা পোশাক দিয়ে বিচার করা যেমন একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক ভুল, তেমনি আল্লাহর বিধান মানার কারণে কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাও একটি গুরুতর ধর্মীয় অপরাধ যা মুমিনের ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। পবিত্র কোরআনে সুরা হুজুরাতের এগারো নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন যে কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম (সুরা হুজুরাত, ৪৯:১১)। একই আয়াতে নারীদেরও একে অপরকে বিদ্রুপ করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং কাউকে মন্দ উপনামে ডাকতে bilon করা হয়েছে কারণ ঈমান আনার পর মন্দ নামে ডাকা অত্যন্ত নিকৃষ্ট কাজ। যাকে মানুষ তার পোশাক বা সাধারণ চেহারার কারণে অবহেলা করছে, আল্লাহর কাছে সেই হয়তো সবচেয়ে প্রিয় ও সম্মানিত বান্দা হতে পারে।

যদি কোনো সম্মানিত বা যোগ্য ব্যক্তিত্বকে কেবল তার luxury বা স্পেশাল পোশাক পরিধান এবং ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের কারণে জেনেশুনে অবজ্ঞা করা হয় বা কৌশলে তাকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় তবে তা মানুষের ঈমানকে ধ্বংস করে দিতে পারে। পবিত্র কোরআনে সুরা তাওবার পঁয়ষট্টি ও ছেষট্টি নম্বর আয়াতে এই ধরণের বিদ্রুপকারীদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর শাস্তি ও সতর্কবার্তা ঘোষণা করা হয়েছে (সুরা তাওবা, ৯:৬৫-৬৬)। যখন মুনাফিকরা তাদের খেল-তামাশার বাহানা তৈরি করেছিল তখন আল্লাহ রাসুলকে বলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে বিদ্রুপ করছিলে। স্রষ্টা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে এখন কোনো অজুহাত দেখিও না, তোমরা তো ঈমান আনার পর পুনরায় কুফরি করেছ এবং এই অপরাধের জন্য শাস্তি অবধারিত।

যা কম স্পষ্ট তা হলো আধুনিক যুগের এই তীব্র পুঁজিবাদী ও বস্তুবাদী সংস্কৃতির আগ্রাসনের সামনে মুসলিম সমাজ তাদের অন্তরের এই তাকওয়া ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ কতটা ধরে রাখতে সক্ষম হবে। বর্তমানের কর্পোরেট দুনিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো মানুষকে ক্রমাগত বাহ্যিক প্রদর্শনীর দিকে ঠেলে দিচ্ছে যা মানুষের ভেতরের নৈতিক গুণাবলীকে অন্ধ করে ফেলছে। বিত্তহীন বা কম সম্পদশালী মানুষদের অবজ্ঞা করার এই জাহেলী মানসিকতা দূর করতে না পারলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠন করা কখনোই সম্ভব নয়। প্রাচীন মক্কার কুরাইশ নেতারাও একদা রাসুলুল্লাহর কাছে দাবি করেছিল যেন তিনি দরিদ্র সাহাবিদের দূরে সরিয়ে কেবল অভিজাত লোকদের নিয়ে আলাদা বৈঠক করেন কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের এই অন্যায় আবদার সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

কুরাইশদের সেই বৈষম্যমূলক মানসিকতার জবাবে আল্লাহ তাআলা সুরা আনআমের বাহান্ন নম্বর আয়াতে রাসুলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের রবের ইবাদত করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে তাদের তুমি কখনোই দূরে সরিয়ে দেবে না (সুরা আনআম, ৬:৫২)। আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে তাদের হিসাব-নিকাশের কোনো দায়িত্ব যেমন রাসুলের ওপর নেই, তেমনি রাসুলের হিসাবের দায়িত্বও তাদের ওপর নেই এবং তাদের দূরে সরিয়ে দিলে তা হবে চরম জুলুম। অতএব যেকোনো পেশাদার বা সামাজিক ক্ষেত্রে সেবা দেওয়ার সময় ধনী-দরিদ্র বিবেচনা না করে যার প্রকৃত হক তাকেই সবসময় অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঘরোয়া অনুষ্ঠান, আত্মীয়তার সম্পর্ক বা বন্ধুমহলে মানুষের চরিত্র, আমানতদারি, দ্বীনদারি এবং তাকওয়ার ভিত্তিতেই প্রকৃত মূল্যায়ন করা উচিত কারণ মানুষের টাকা, ক্ষমতা ও বাহ্যিক সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী কিন্তু সৎ আমলই দুনিয়া ও আখিরাতে চিরস্থায়ী মর্যাদার আসল মানদণ্ড।

banner
Link copied!