রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

লোক দেখানো আমল ও সূক্ষ্ম শিরক থেকে বাঁচার উপায়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৪, ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম

লোক দেখানো আমল ও সূক্ষ্ম শিরক থেকে বাঁচার উপায়

ইসলামে তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদের পরিপন্থী সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক গুনাহ হলো শিরক করা যার কোনো ক্ষমা নেই বলে পবিত্র সনাতন গ্রন্থে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এই প্রকাশ্য ও বড় শিরকের পাশাপাশি সমাজ জীবনে এমন এক ধরণের সূক্ষ্ম পাপের অস্তিত্ব রয়েছে যা মানুষের সমস্ত নেক আমলকে ভেতরে ভেতরে ধ্বংস করে দেয়। ইসলামিক পরিভাষায় একে শিরকে আসগর বা ছোট শিরক বলা হয় যার অন্যতম প্রধান রূপ হলো রিয়া বা লোক দেখানো আমল করা। উম্মাহ কণ্ঠের এক বিশেষ ধর্মীয় পর্যালোচনায় জানানো হয়েছে যে অনেক সময় একজন মুমিন অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ইবাদত সম্পন্ন করার পরও কেবল মানুষের প্রশংসা ও সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার সূক্ষ্ম আকঙ্ক্ষার কারণে তার সেই আমলটি আল্লাহর দরবারে বাতিল হয়ে যেতে পারে। মুসনাদে আহমদ ও আদাবুল মুফরাদের নির্ভরযোগ্য হাদিস অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রিয় সাহাবিদের এই গোপন ও সূক্ষ্ম পাপের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন এবং তা থেকে আত্মরক্ষার জন্য একটি বিশেষ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার তার সাহাবিদের উদ্দেশ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে তিনি তার উম্মতের ব্যাপারে যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি ভয় পান তা হলো এই শিরকে আসগর বা ছোট শিরক। সাহাবিরা যখন আল্লাহর রাসুলের কাছে এই ছোট শিরকের প্রকৃত স্বরূপ ও ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন তখন তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন যে এটি হলো মূলত রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত করা। মুসনাদে আহমদের পঞ্চম খণ্ডের চারশত আটাশ ও চারশত ঊনত্রিশ পৃষ্ঠায় এই ঐতিহাসিক বর্ণনাটি সংরক্ষিত রয়েছে যা একজন মুসলিমের জন্য নিয়তের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার তাগিদ দেয়। মানুষ যখন কোনো ইবাদত বা ভালো কাজ করার সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেয়ে সমাজের মানুষের বাহবা বা কোনো পার্থিব স্বার্থকে মনে মনে প্রধান্য দেয় তখন সে মূলত এই আধ্যাত্মিক সংকটের মুখোমুখি হয়।

এই গোপন পাপের গভীরতা এবং ভয়াবহতা সাধারণ মানুষের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি সূক্ষ্ম হতে পারে যা অনেক সময় টেরও পাওয়া যায় না। বিশিষ্ট সাহাবি মাকিল ইবনে ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত এক রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে যে তিনি একবার প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত ছিলেন। তখন আল্লাহর নবী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি উপমা দিয়ে বলেছিলেন যে মানুষের অন্তরে এই সূক্ষ্ম শিরকের প্রবেশ ঘটে অত্যন্ত নিঃশব্দে যেভাবে একটি অন্ধকার রাতে কালো পাথরের ওপর দিয়ে পিপীলিকা হেঁটে যায়। ইমাম বুখারীর সংকলিত আল আদাবুল মুফরাদের সাতশত একুশ নম্বর হাদিসে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাটি বর্ণিত হয়েছে যা প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আলবানী রহমতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক সম্পূর্ণ সহীহ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো আধুনিক যুগের ডিজিটাল জীবনযাত্রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এই লোক দেখানো আমল বা রিয়ার প্রবণতা আমাদের অজান্তেই কতটা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান সময়ে মানুষ যেকোনো নেক আমল যেমন দান-সদকা, ওমরাহ পালন বা নামাজ পড়ার সাথে সাথেই তা ইন্টারনেটে প্রকাশ করে মানুষের লাইক, কমেন্ট ও প্রশংসার প্রত্যাশা করে যা সরাসরি শিরকে আসগর বা ছোট শিরকের পথকে উন্মুক্ত করে দেয়। এই ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ থেকে নিজের ঈমানকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবিদের একটি চমৎকার দোয়া শিখিয়েছেন যার অর্থ হলো হে আল্লাহ আমি জেনে-শুনে আপনার সঙ্গে কাউকে শরিক করা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং না জেনে যে শিরক আমার দ্বারা হয়ে যায় তার জন্য আপনার কাছে ক্ষমা চাই। এই দোয়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি মানুষের জানা এবং অজানা সব ধরণের মনস্তাত্ত্বিক বিচ্যুতি থেকে আল্লাহর ঐশ্বরিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করে।

ইসলামিক চিন্তাবিদ ও গবেষকদের মতে একজন প্রকৃত মুমিনের সবচেয়ে বড় মূল্যবান সম্পদ হলো তার বিশুদ্ধ তাওহিদ ও একনিষ্ঠ ইবাদত যা কোনো ধরণের লোক দেখানো মনোভাব সহ্য করে না। এই শিরকে আসগর মানুষকে সরাসরি ইসলাম থেকে বের করে না দিলেও তা তাওহিদের মূল ভিত্তিকে ভেতর থেকে অত্যন্ত দুর্বল করে দেয় এবং পরকালে আমলনামাকে সম্পূর্ণ শূন্য করে দেয়। এই কারণে প্রতিদিনের ফরজ ও নফল ইবাদতের পাশাপাশি নিজের নিয়তকে বারবার পরীক্ষা করা এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিখানো এই ঐতিহ্যবাহী দোয়াটি নিয়মিত পাঠ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কোরআন ও সুন্নাহর এই অমূল্য নির্দেশনাগুলো বাস্তব জীবনে অক্ষরে অক্ষরে পালন করার মাধ্যমেই কেবল সমাজে নৈতিকতা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব যা পরকালে পরম মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে গণ্য হবে।

banner
Link copied!