ব্রেইন স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে রোগী ও পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই হতাশ হয়ে পড়েন এবং মনে করেন যে হয়তো আর কখনও স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করা সম্ভব হবে না। বাস্তবে বিষয়টি সবসময় এমন নয়। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি, নিয়মিত ফিজিওথেরাপি এবং সুপরিকল্পিত পুনর্বাসনের মাধ্যমে অনেক রোগীই তাদের হারিয়ে যাওয়া শারীরিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ ফিরে পেতে সক্ষম হন।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর যারা প্রাথমিক পর্যায়ে হাঁটাচলার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ রোগী উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে আবার স্বাধীনভাবে হাঁটার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন। অবশ্য এই উন্নতির গতি সবার ক্ষেত্রে সমান নয়; রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং স্ট্রোকের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে পুনরুদ্ধারের সময়সীমা ভিন্ন হতে পারে। তাই হতাশ না হয়ে চিকিৎসকের নির্দেশিত নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি।
এই উন্নতির মূল চাবিকাঠি হলো আমাদের মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি নামক এক অসাধারণ ক্ষমতা। যখন স্ট্রোকের ফলে মস্তিষ্কের কোনো নির্দিষ্ট অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন মস্তিষ্কের সুস্থ কোষগুলো নতুনভাবে নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশের কিছু কাজের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয়। এটি অনেকটা বিকল্প রাস্তা তৈরির মতো। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই রোগী ধীরে ধীরে হাত-পায়ের নড়াচড়া এবং দৈনন্দিন জীবনের কাজ করার ক্ষমতা পুনরায় অর্জন করেন। পাশাপাশি, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কেও নিউরোজেনেসিস বা নতুন স্নায়ুকোষ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে স্ট্রোকের প্রভাব কেবল শারীরিক সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই পরবর্তী সময়ে গুরুতর মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন স্ট্রোক রোগীদের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ একটি ব্যাধি। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রথমবারের মতো ইস্কেমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোগী কোনো না কোনো মাত্রায় বিষণ্নতায় ভোগেন। তারা আগের মতো স্বাভাবিক আনন্দ অনুভব করতে পারেন না, সবসময় মন খারাপ থাকে এবং সামাজিকভাবে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয় (ইনাম এমএস ও অন্যান্য, ২০২২)।
স্ট্রোক রোগীর শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সমান গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। প্রয়োজন হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ, ওষুধের ব্যবহার এবং মনোসামাজিক সহায়তার মাধ্যমে এই বিষণ্নতা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। ব্রেইন স্ট্রোক মানেই জীবনের শেষ নয় কিংবা হতাশার নামান্তর নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা, পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা, ধৈর্য এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস থাকলে অনেক রোগীই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। নিজের কাজ নিজে করার ক্ষমতা ফিরে পেতে যে দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ের প্রয়োজন হয়, তাতে চিকিৎসক এবং ফিজিওথেরাপিস্টের দিকনির্দেশনা মেনে চলাটাই সাফল্যের প্রধান শর্ত।
