মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩

মায়ের বুকের ওম: শিশুর গভীর ঘুমের বৈজ্ঞানিক রহস্য

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৫, ২০২৬, ১০:২৩ পিএম

মায়ের বুকের ওম: শিশুর গভীর ঘুমের বৈজ্ঞানিক রহস্য

সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ঘুমানোর মধ্যে যে এক পরম শান্তি ও প্রশান্তি রয়েছে, তা প্রতিটি মায়ের হৃদয়েই অনুভূত হয়। ছোট্ট শরীরটা যখন মায়ের বুকের উষ্ণতার সাথে মিশে থাকে, তখন এক জাদুকরী বন্ধন তৈরি হয়। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত কিছু সামাজিক ধারণার কারণে অনেক নতুন মা দ্বিধায় ভোগেন। চারপাশের মানুষজন যখন পরামর্শ দেন যে বাচ্চাকে সবসময় কোলে রাখা যাবে না অথবা একা ঘুমানোর অভ্যাস করতে হবে, তখন মায়েদের মনে এক ধরনের অপরাধবোধ তৈরি হয়। আধুনিক বিজ্ঞান এই প্রচলিত ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মায়ের সান্নিধ্যের এক অসাধারণ ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তুলে ধরেছে।

কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নিলস বার্গম্যান এই বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করেছেন। তার গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল নবজাতক শিশু যখন মায়ের বুকের সাথে লেগে থাকে এবং যখন তাকে আলাদা কোনো দোলনায় শুইয়ে রাখা হয়, তখন তাদের মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপে কী ধরনের পরিবর্তন আসে তা পর্যবেক্ষণ করা। মাত্র দুই দিন বয়সী নবজাতকদের ওপর পরিচালিত এই নিরীক্ষায় ব্রেইন স্ক্যান এবং হৃদস্পন্দনের ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এক চমকপ্রদ তথ্য খুঁজে পেয়েছেন। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে শিশু যখন মায়ের বুকের সংস্পর্শে থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক এবং শরীর এক বিশেষ প্রশান্তির অবস্থায় চলে যায়।

মায়ের গায়ের ঘ্রাণ এবং হৃদস্পন্দনের ছন্দ শিশুর হৃদস্পন্দনকে স্বাভাবিক রাখে এবং শ্বাসপ্রশ্বাসকে গভীর ও স্থিতিশীল করে তোলে। এই শারীরিক নৈকট্য শিশুকে এক প্রকার সুরক্ষার অনুভূতি দেয়, যা সরাসরি তার স্নায়ুতন্ত্রের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে মায়ের বুকে থাকা অবস্থায় শিশুর মস্তিষ্ক ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় এক বিশেষ ছন্দে কাজ করে। নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের জন্য মস্তিষ্কের এই শান্ত ও স্থিতিশীল অবস্থা অত্যন্ত জরুরি, যা কেবল মায়ের সান্নিধ্যেই পাওয়া সম্ভব।

গবেষণার পরবর্তী ধাপে বিজ্ঞানীরা সেই একই শিশুকে মায়ের কোল থেকে সরিয়ে একটি আরামদায়ক দোলনায় একা শুইয়ে দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। ফলাফলে দেখা যায়, একা থাকার সাথে সাথেই শিশুটির মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপে পরিবর্তন এসেছে। তার মস্তিষ্ক অনেক বেশি অস্থির এবং সতর্ক হয়ে উঠেছে। যদিও বাইরে থেকে তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে শান্তভাবে ঘুমাচ্ছে, কিন্তু ব্রেইন স্ক্যান দেখাচ্ছিল যে তার মস্তিষ্ক এক ধরণের মানসিক চাপের বা আতঙ্কের মোকাবিলা করছে। বিবর্তনের ধারায় মানুষের শিশুরা এভাবেই বড় হয়েছে। তাদের অবচেতন মন একা থাকা মানেই বিপদের ইঙ্গিত বলে ধরে নেয়, ফলে শরীর ও মস্তিষ্ক সতর্ক পাহারায় চলে যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে টিকে থাকার লড়াই বলা যেতে পারে। একা থাকার কারণে শিশু তার স্বাভাবিক গভীর ঘুমের ছন্দ হারিয়ে ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে যে একা ঘুমানোর ফলে শিশুর গভীর ঘুমের হার প্রায় ছিয়াশি শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বাজারে শিশুদের শান্ত রাখার জন্য যতই আধুনিক কম্বল বা দামি প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম থাকুক না কেন, মায়ের বুকের ওমের কোনো বিকল্প নেই। মাতৃগর্ভে থাকার সময় থেকে শিশু মায়ের হৃদস্পন্দনের যে ছন্দের সাথে পরিচিত হয়, পৃথিবীর আলোয় আসার পর সেটাই তার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ ও বিশ্বস্ত আশ্রয় হিসেবে গণ্য হয়।

মায়ের কোল বা স্কিন-টু-স্কিন কন্টাক্ট কোনোভাবেই কোনো বাজে অভ্যাস নয়। বরং এটি সন্তানের সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য একটি বিশুদ্ধ ও অপরিহার্য জীববিজ্ঞান। এই সময়টিতেই শিশু তার মায়ের কাছ থেকে শেখে যে পৃথিবীটি নিরাপদ। শৈশবের এই নিরাপত্তা বোধ পরবর্তী জীবনে একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে তাকে সাহায্য করে। তাই অন্যের পরামর্শে বিভ্রান্ত না হয়ে নিজের সন্তানের প্রয়োজনকে বুঝুন। মাতৃত্বের এই সময়টি খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়, তাই দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে এই অমূল্য ও সুন্দর মুহূর্তগুলো উপভোগ করা প্রতিটি মায়ের অধিকার।

banner
Link copied!