লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর স্থল অভিযান ও তীব্র বোমাবর্ষণের কারণে দেশটির হাজার বছরের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো চরম ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তথাকথিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে গত শনিবার ইসরায়েলি সৈন্যরা দেশটির দক্ষিণের কৌশলগত শহর নাবাতিয়াহর কাছে অবস্থিত প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক বোফোর্ট দুর্গ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে চলা তীব্র লড়াইয়ের পর এই দুর্গটি দখল করা হয়, যা গত ২৬ বছরের মধ্যে লেবাননের অভ্যন্তরে ইসরায়েলের সবচেয়ে গভীর ও বড় ধরনের সামরিক অনুপ্রবেশ।ইসরায়েলি বাহিনী ইতিমধ্যে লিতানি নদী পার হয়ে জাহরানি নদীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
লেবাননের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলে চলমান এই অবিরাম হামলার কারণে প্রাচীন ফিনিশীয় সভ্যতার ঐতিহাসিক শহর টায়ারসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ল্যান্ডমার্ক এখন মারাত্মক বিপদের মধ্যে রয়েছে। বৈরুত থেকে প্রায় ৮৩ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত টায়ার নগরীতে প্রাচীন রোমান যুগের বিস্তীর্ণ ধ্বংসাবশেষ এবং রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম বৃহত্তম হিপোড্রোম বা ঘোড়দৌড়ের মাঠ রয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর আকস্মিক উচ্ছেদ আদেশ এবং ভারী বোমাবর্ষণের কারণে টায়ার ও এর আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় দুই লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে এই যুদ্ধের কারণে পুরো লেবানন জুড়ে ইতিমধ্যে ১০ লাখ বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের প্রাচীন টায়ার নগরী একসময় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও পরাশক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে গ্রিক, রোমান এবং বাইজেন্টাইন শাসনামলে এই শহরের ব্যাপক বিস্তার ঘটে, যা ক্রুসেড বা ক্রুসেডারদের পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। লেবাননের সংস্কৃতি মন্ত্রী ঘাসান সালামে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বোমাবর্ষণের তীব্র আঘাত টায়ারের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের ঠিক কাছাকাছি এসে পড়েছে এবং মধ্যযুগীয় বোফোর্ট দুর্গটি সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী লেবাননের প্রায় ৩৯টি সাংস্কৃতিক স্থানকে ইউনেস্কোর বিশেষ সুরক্ষার আওতায় রাখা হলেও চলমান সামরিক অভিযানে সেসবের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।
ইউনেস্কোর সংস্কৃতি বিষয়ক সহকারী মহাপরিচালক লাজারে ইলোনডু এসোমো এক বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেছেন, যেকোনো দেশে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ধ্বংস হওয়ার অর্থ হলো মানুষের নৈতিক মানদণ্ড ও সামাজিক সংহতি নষ্ট হওয়া। আন্তর্জাতিক আইন এবং ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন অনুযায়ী এই ধরনের সুরক্ষিত স্থাপনায় হামলা চালানো সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এর জন্য আন্তর্জাতিক আদালতেফৌজদারি অপরাধের দায় চাপানো যেতে পারে। ৭০০ মিটার উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই বোফোর্ট দুর্গটি ঐতিহাসিকভাবে উসমানীয় সাম্রাজ্যসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, যা ১৯৮২ সালের আক্রমণেও ইসরায়েল দখল করেছিল।
বর্তমানের এই ব্যাপক ঐতিহাসিক ক্ষয়ক্ষতি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাসকে চিরতরে মুছে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘস্থায়ী এই আগ্রাসনের ফলে লেবাননের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক পরিচয় হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে, যা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। চলমান বোমাবর্ষণ বন্ধ না হলে এই অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতার অবশিষ্টাংশ সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
