মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬, ২ আষাঢ় ১৪৩৩

জেনেভায় মার্কিন-ইরান চুক্তি ও ইরানের রাজনৈতিক সংকট

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৬, ২০২৬, ০৮:২৮ পিএম

জেনেভায় মার্কিন-ইরান চুক্তি ও ইরানের রাজনৈতিক সংকট

ছবি : সংগৃহীত

ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রাজনৈতিক উপদলের মধ্যে জেনেভায় মার্কিন-ইরান চুক্তি নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে বলে তেহরান থেকে আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। গত রবিবার দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ঘোষণার পর থেকেই তেহরানের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা থাকলেও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নানামুখী বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের কট্টরপন্থী নেতারা এই চুক্তিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সামনে এক ধরনের আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে দেশের উদারপন্থী এবং সংস্কারবাদী গোষ্ঠীগুলো এই চুক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং চলমান যুদ্ধাবস্থার অবসান আশা করছে।

চলতি দুই হাজার ছাব্বিশ সালের আটাশে ফেব্রুয়ারি তেহরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার মাধ্যমে যে বিধ্বংসী সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, তা এই চুক্তির মাধ্যমে একটি নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের মধ্যস্থতায় গত চৌদ্দই জুন একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি অর্জিত হয়, যা ইতিমধ্যে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব ডিজিটালভাবে অনুমোদন করেছেন। তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই জেনেভায় মার্কিন-ইরান চুক্তিটি দীর্ঘমেয়াদে কতটা সফল হবে তা নিয়ে ব্যাপক সংশয় রয়েছে। দেশটির নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে সাধারণ স্তরের জনগণের মধ্যে পশ্চিমা শক্তির বিশ্বস্ততা নিয়ে চরম অনাস্থা বিদ্যমান।

কট্টরপন্থী ফার্সি সংবাদমাধ্যম এবং প্রভাবশালী নেতারা মনে করেন যে মার্কিন প্রশাসন কখনোই তাদের পূর্বের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি এবং এই চুক্তি ইরানের সার্বভৌমত্বকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে। তারা যুক্তি দিচ্ছেন যে সামরিক প্রতিরোধের মাধ্যমে পশ্চিমাদের মোকাবেলা করাই ইসলামের নীতি এবং এটিই ইরানের জন্য একমাত্র নিরাপদ পথ। অন্যদিকে সংস্কারবাদী নেতারা যুক্তি দিচ্ছেন যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে এবং দেশের সাধারণ মুসলিম জনগণের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে। যা কম স্পষ্ট তা হলো ইরানের最高 ধর্মীয় নেতা এই অভ্যন্তরীণ political দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে এবং দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের কঠোর সিদ্ধান্ত নেবেন।

আগামী ষাট দিনের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, ইউরেনিয়াম মজুত হ্রাস এবং দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তেহরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই আসন্ন আলোচনায় ইরানের কৌশলগত স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা না হয়, তবে অভ্যন্তরীণ তীব্র বিক্ষোভের মুখে এই রূপরেখা চুক্তিটি সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যেতে পারে। এর আগে দুই হাজার পনেরো সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির সময়ও ইরানি উপদলগুলোর মধ্যে একই ধরনের তীব্র মতবিরোধ দেখা গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি থেকে একতরফা বের হয়ে যাওয়ার কারণে প্রমাণিত হয়েছিল। বর্তমান এই জেনেভায় মার্কিন-ইরান চুক্তিটি তাই শুধুমাত্র একটি আন্তর্জাতিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নয়, বরং এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যের এবং ভবিষ্যৎ ভূরাজনীতির এক বড় পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

banner
Link copied!