ঐতিহাসিক মার্কিন-ইরান চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ সংঘাতের অবসান ঘটতে যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল মনে করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বুধবার ফ্রান্সের বার্সেই প্রাসাদে ইরানের সাথে যুদ্ধ বন্ধের একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে বলে রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে ফ্রান্সে অবস্থানকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর নৈশভোজে এই ঐতিহাসিক নথিতে স্বাক্ষর করেন। দীর্ঘ আলোচনা ও বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী দেশের প্রচেষ্টার পর উভয় দেশ এই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
চৌদ্দ দফার এই সমঝোতা স্মারকের অধীনে উভয় পক্ষ আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই সাময়িক সময়সীমা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে আরও বৃদ্ধি করা যেতে পারে। নতুন এই মার্কিন-ইরান চুক্তি এর সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে তারা ইতিমধ্যে তাদের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই অবরোধ সম্পূর্ণভাবে তুলে নেওয়া হবে। অন্যদিকে ইরান আগামী ৬০ দিনের জন্য কোনো প্রকার শুল্ক বা বাড়তি চার্জ ছাড়াই এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা দিয়েছে।
সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রপ্তানি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং সেবার ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ওয়েভার বা ছাড় জারি করেছে। এর ফলে তেহরান আন্তর্জাতিক বাজারে অবাধে তেল বিক্রি শুরু করার সুযোগ পাচ্ছে যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি এনেছে। এছাড়া ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ তহবিল গঠনের প্রস্তাব এই আলোচনায় স্থান পেয়েছে। তবে ওয়াশিংটনে এই তহবিলে মার্কিন অর্থায়নের তীব্র সমালোচনা হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন যে মার্কিন প্রশাসন এই তহবিলে এক সেন্টও বিনিয়োগ করবে না এবং এটি মূলত বেসরকারি খাত ও বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
পরমাণু কর্মসূচির ক্ষেত্রে ইরান তার ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার সরাসরি তত্ত্বাবধানে নিজস্ব ভূখণ্ডেই পাতলা বা মিশ্রিত করতে সম্মত হয়েছে। তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ার মধ্যেও নতুন মার্কিন-ইরান চুক্তি নিয়ে উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক অবিশ্বাস ও চরম উত্তেজনা বজায় রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি মেনে চলার বিষয়ে ইরানকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন যে তেহরান শর্ত লঙ্ঘন করলে সেখানে পুনরায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হবে। অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে আমেরিকার মতো শত্রুর ওপর তাদের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই এবং ইরানের সামরিক বাহিনীর আঙুল এখনো ট্রিগারেই রয়েছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে কি না।
