ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদের রাজপথে বিশাল জনসমুদ্রের মধ্য দিয়ে শেষ বিদায় জানানো হলো দেশটির সদ্য প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে। কয়েক দিনব্যাপী শোক কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টেনে তাকে মাশহাদের ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়েছে। শিয়া মুসলমানদের জন্য এটি ইরানের সবচেয়ে পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত। বিবিসি নিউজ এবং রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ অংশ নিয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, কয়েক দিন ধরে দেশটির পাঁচটি শহর এবং প্রতিবেশী ইরাকে শোকসভা ও আনুষ্ঠানিকতার পর মাশহাদে এই দাফন সম্পন্ন হয়। শোকযাত্রার চিত্রগুলোতে দেখা যায়, কালো পোশাকে সজ্জিত হাজার হাজার মানুষ মাশহাদের প্রধান সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তাদের অনেকের হাতে ছিল ইরানের পতাকা এবং প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত লাল ব্যানার। শোকসন্তপ্ত জনতাকে তাদের প্রিয় নেতার ছবি বহন করতে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা গেছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে তেহরানে নিজের বাসভবনে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারান আলী খামেনি। সেই দিনটি ছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের প্রথম দিন। দীর্ঘ সাঁইত্রিশ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তার এই আকস্মিক মৃত্যুতে ইরানের শাসন কাঠামোয় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তার উত্তরাধিকারী হিসেবে পুত্র মোজতবার নাম শোনা গেলেও, তাকে শেষকৃত্যের কোনো আয়োজনেই দেখা যায়নি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, তেহরানের ওই একই হামলায় মোজতবা গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দাফন অনুষ্ঠানের আবহ ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। ট্রাকে করে আলী খামেনির কফিন মাশহাদের রাজপথ দিয়ে ইমাম রেজার মাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। শোকের আবহেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তাপ ছিল স্পষ্ট। একদিকে যখন খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে, অন্যদিকে ঠিক তখনই নতুন করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা শুরু হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের সক্ষমতা কমানোর লক্ষ্যে তারা নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় রেভল্যুশনারি গার্ড দাবি করেছে, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোতে তারা আঘাত করেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে দেশের ঐক্য ও শক্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতায় এবং গত জানুয়ারি মাসে বড় ধরনের বিক্ষোভের জেরে নিরাপত্তাবাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে জনমনে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। কাতারভিত্তিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা প্রশমন নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, তা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধের আগে দুই পক্ষের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা এখন শেষ হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করছেন। এই অস্থির পরিস্থিতিতে খামেনির দাফন শেষ হলেও, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন এক বিশাল প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
