ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে মরক্কোর ফুটবল নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। ফুটবলবোদ্ধাদের মতে, মরক্কো কেবল একটি চমক নয় বরং বিশ্ব ফুটবলের একটি নতুন শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছে। ব্রিটিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ এবং রয়্যাল মরোক্কান ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক কারিগরি পরিচালক নিল ওয়ার্ডের মতে, এই দেশটির ফুটবল পরিকাঠামোর যে আমূল পরিবর্তন হয়েছে, তা কেবল ভাগ্যের জোরে ঘটেনি। এটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সুফল।
২০২০ সাল থেকে রাবাতে অবস্থানকালে নিল ওয়ার্ড দেখেছেন কীভাবে এই দেশটি ফুটবলের পেছনে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এবং সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে অত্যাধুনিক ট্রেনিং সেন্টার, জাতীয় ফুটবল একাডেমি এবং আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। হাজার হাজার সাধারণ মানের মাঠ সংস্কার এবং নতুন মাঠ তৈরির মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায় থেকে খেলোয়াড় খুঁজে বের করার কাজ চলছে। নিল ওয়ার্ড জানান, ইউরোপের উন্নত ক্লাবগুলোতে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেখা যায়, মরক্কোর নতুন স্থাপনাগুলো তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এই অবকাঠামোগত বিনিয়োগই মরক্কোর খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে।
মরক্কোর এই উত্থানের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো তাদের প্রবাসীদের বা ডায়াস্পোরা খেলোয়াড়দের সম্পৃক্ত করা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেড়ে ওঠা মরক্কোর বংশোদ্ভূত তরুণ খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করতে সারা বিশ্বে পূর্ণকালীন স্কাউট নিয়োগ করেছে তাদের ফুটবল ফেডারেশন। সাইমন জেনিংস, যিনি মরক্কোর যুব উন্নয়নের দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনি জানান যে এসব খেলোয়াড়দের তারা কেবল মরক্কোর খেলোয়াড় হিসেবেই গ্রহণ করে না, বরং তাদের জাতীয় পরিচয় ও আবেগের সাথেও যুক্ত করে। যার ফলে বর্তমান বিশ্বকাপের দলে থাকা অনেক সদস্য বিদেশে জন্মগ্রহণ করলেও দেশের জার্সি গায়ে চাপাতে তারা অত্যন্ত গর্ববোধ করেন।
ফ্রান্সের বিপক্ষে আসন্ন ম্যাচেও এর প্রতিফলন দেখা যাবে। মরক্কোর এই দলের অনেক খেলোয়াড়ই ফ্রান্সের বিভিন্ন ক্লাব বা যুবদলে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঠের লড়াইয়ে এটি বাড়তি উত্তাপ ছড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু ফুটবল নয়, এই সাফল্য মরক্কোর জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ধরনের সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করছে। দেশটি প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ থাকলে যে কোনো দেশ বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জয়ী হতে পারে।
মরক্কোর এই যাত্রা কেবল একটি টুর্নামেন্টের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের অন্যতম স্বাগতিক হিসেবে দেশটি নিজেদের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি ফুটবলের মাধ্যমে তারা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে চায়। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে জয়ী হতে পারলে তা হবে তাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্জন। তবে ফলাফল যা-ই হোক, বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে মরক্কো এখন একটি শক্ত অবস্থানে পৌঁছে গেছে, যা নিকট ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
