যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বুধবার এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে প্রয়াত বিতর্কিত ব্যবসায়ী জেফরি ইপস্টাইনের সাথে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সম্পর্ক ছিল, আল জাজিরা ও এপি নিশ্চিত করেছে। জনপ্রিয় পডকাস্টার জো রোগানের সাথে তিন ঘণ্টার এক দীর্ঘ আলোচনায় ভ্যান্স এই মন্তব্য করেন যা ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই বিশ্বজুড়ে প্রকাশ পায়। সেখানে তিনি খোলাখুলিভাবে উল্লেখ করেন যে ইপস্টাইনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পাশাপাশি ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপর্যায়ের গোপন যোগাযোগ ছিল। এই চাঞ্চল্যকর দাবিটি হোয়াইট হাউসের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসার পর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
জো রোগানের পডকাস্টে আলোচনার সময় ভ্যান্সকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছিল যে ইপস্টাইনের সাথে ইসরায়েলের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের কোনো গোপন প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ছিল কি না। জবাবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন যে ইপস্টাইন স্পষ্টভাবেই মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং এটি কোনো সাধারণ অনুমান নয়। তিনি আরও দাবি করেন যে ইসরায়েলে ইপস্টাইনের এই যোগাযোগগুলো মূলত দেশটির রাজনৈতিক বামপন্থী ঘরানার গভীর রাষ্ট্র বা ডিপ স্টেটের উপাদানগুলোর সাথে ছিল। ভ্যান্স এটিকে অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও রহস্যময় বলে অভিহিত করেন কারণ তাঁর মতে ইপস্টাইন ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতির সাথে বা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শিবিরের সাথে ততটা যুক্ত ছিলেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিনি সব দলের সাথে সম্পর্ক রাখলেও ইসরায়েলে তাঁর অবস্থান ছিল ভিন্ন।
এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স ট্রাম্প প্রশাসনের অতীত কার্যক্রমের সমালোচনা করতেও দ্বিধা করেননি এবং খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেন যে ইপস্টাইন সংক্রান্ত গোপন ফাইলগুলো প্রকাশের ক্ষেত্রে তাদের মিডিয়া ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। তিনি সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডির কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন যিনি অতীতে গণমাধ্যমের সামনে দাবি করেছিলেন যে ইপস্টাইনের গোপন মক্কেলদের একটি সম্পূর্ণ তালিকা সরাসরি তাঁর ডেস্কে রয়েছে। ভ্যান্স বলেন যে প্যাম বন্ডি সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র চাপ সামলাতে গিয়ে কিছুটা অতিরঞ্জিত মন্তব্য করেছিলেন যা জনগণের মধ্যে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে এক ধরণের গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছিল। তবে তিনি পরিষ্কার করেন যে এই ব্যর্থতার পেছনে কোনো ক্ষতিকারক উদ্দেশ্য বা কোনো সত্য গোপন করার চেষ্টা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি কৌশলগত ভুল।
যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে ইপস্টাইনের এই গোপন যোগাযোগের সুনির্দিষ্ট নথিগুলো এখন পুরোপুরি সাধারণ মানুষের সামনে আসবে কি না। মার্কিন বিচার বিভাগ ইতিমধ্যে ইপস্টাইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের অধীনে গত জানুয়ারিতে ৩০ লাখেরও বেশি নথির পৃষ্ঠা, ২,০০০টি ভিডিও এবং ১,৮০,০০০টি ছবি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেছে। এর আগে ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্কের একটি কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে যৌন পাচারের মামলায় বিচার শুরুর আগেই ইপস্টাইনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ ও সমালোচকেরা দীর্ঘকাল ধরে দাবি করে আসছেন যে ধনী ও রাজনৈতিক অভিজাতদের সাথে ইপস্টাইনের এই নেটওয়ার্ক কেবল সাধারণ অপরাধ ছিল না, বরং এর পেছনে গভীর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইল ও গোয়েন্দা স্বার্থ জড়িত ছিল যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ইপস্টাইনের এই ঘটনাটি ২০০৮ সালের ফ্লোরিডার একটি আদালতের মামলার সময় থেকেই আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজরে আসে যখন তিনি তুলনামূলকভাবে কম সাজা পেয়ে পার পেয়ে গিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে এই লঘু শাস্তিকে অনেকেই প্রভাবশালীদের সমঝোতার চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং ভ্যান্সও সেটিকে এই তদন্তের মূল অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেন। ভ্যান্সের এই সাম্প্রতিক পডকাস্ট মন্তব্যটি এমন এক সময়ে এল যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে নানামুখী বিতর্ক চলছে। উম্মাহ কণ্ঠের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান যে এই ধরনের মন্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচনী কৌশলের অংশ হতে পারে।
