বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: দ্বীপ দখলে কি প্রস্তুত ওয়াশিংটন?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১৫, ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: দ্বীপ দখলে কি প্রস্তুত ওয়াশিংটন?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত বর্তমানে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন বাহিনী ইরানের কেশম, কিশ এবং আবু মুসা দ্বীপে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর বন্দর আব্বাসসহ উপকূলীয় এলাকাগুলোতেও মার্কিন বোমাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। এই সামরিক কর্মকাণ্ডের ফলে ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে একটি বড় প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের কোনো ভূখণ্ড দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে?

যুদ্ধের শুরু থেকেই এই বিষয়টি নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে দুইজন বেনামী মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল যে, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ খারক দ্বীপ দখলের জন্য সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করছে। খারক দ্বীপটি ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই স্থল অভিযান নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়। জুনের সতেরো তারিখে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর দ্বীপ দখলের আলোচনা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন কোনো অভিযানের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ না করায় পুনরায় এই বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে বিচার করলে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ইরানি দ্বীপ দখলের সামরিক শক্তি রয়েছে। কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, সংকীর্ণ কৌশলগত দিক থেকে দেখলে মার্কিন বাহিনীর এই ধরনের অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা আছে। প্রয়োজনীয় বিমান ও নৌ শক্তি ব্যবহার করে ছোট কোনো ইরানি দ্বীপ দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব একটা কঠিন নয়। তবে এর ফলে যে উত্তজনা সৃষ্টি হবে, তা সামাল দেওয়ার মতো ধৈর্য ওয়াশিংটনের আছে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের সংশয় রয়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনুমানিক ৫০ হাজার সৈন্য মোতায়েন রয়েছে, যারা স্থায়ী ঘাঁটি কিংবা অগ্রবর্তী অবস্থানে অবস্থান করছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিষয়ের অধ্যাপক নাদের হাশেমির মতে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান সামরিক শক্তি হিসেবে এই দ্বীপগুলো দখল করার মতো সামরিক ও লজিস্টিক সক্ষমতা রাখে। তবে মূল প্রশ্নটি দ্বীপ দখলের নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্যয়ের। কোনো দ্বীপ সাময়িকভাবে দখল করা আর তা ধরে রাখা বা সেখান থেকে দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা আদায় করা দুটি ভিন্ন বিষয়। বিশেষ করে কেশম দ্বীপের মতো বড় ভূখণ্ড দখল করে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন হতে পারে, কারণ এটি ইরানের মূল ভূখণ্ডের খুব কাছে অবস্থিত।

ছোট দ্বীপগুলোর ক্ষেত্রেও ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি। হেঙ্গাম দ্বীপের মতো ছোট কোনো দ্বীপ দখল করা হয়তো সহজ হতে পারে, তবে তা ইরানের গোলন্দাজ বাহিনী, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছোট নৌবহরের হামলার আওতায় থাকবে। আন্দ্রেয়াস ক্রিগ সতর্ক করে বলেছেন, একসাথে একাধিক দ্বীপ দখল করতে গেলে তা একটি সীমিত সামরিক অভিযানের বদলে বড় ধরনের উভচর অভিযানে পরিণত হবে। আর এমন অভিযান মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

দ্বীপ দখলের কৌশলগত সুফলের চেয়ে এর ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, দ্বীপগুলো দখল করা হলেও তা হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রভাব খর্ব করতে পারবে না। বরং এর ফলে সেখানে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনারা ইরানের ক্রমাগত হামলার মুখে পড়বে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যুক্তরাষ্ট্র দখলদার শক্তি হিসেবে চিহ্নিত হবে, যা তেহরানকে নতুন করে নৈতিক সুবিধা প্রদান করবে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের এই বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত পিছু হটতে রাজি নয়। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে অনেকটা যুদ্ধের দামামা শোনা যাচ্ছে, যা বিশ্লেষকদের শঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য যদি ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয়, তবে দ্বীপ দখলের চেয়ে তাদের বিমান হামলা ও নৌ অবরোধের কৌশলই বেশি কার্যকর। তবে ট্রাম্প প্রশাসন যদি তাদের কৌশল পরিবর্তন করে দ্বীপ দখলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটে, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, সামরিক সক্ষমতা থাকলেও রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতায় ইরান বা পারস্য উপসাগরের দ্বীপগুলো দখল করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব সহজ কোনো সমাধান নয়। যুদ্ধের ব্যয় এবং এর পরবর্তী প্রভাব সম্পর্কে ওয়াশিংটন সম্ভবত অবগত আছে। তাই এই ধরনের মন্তব্য বেলিকোজ বা যুদ্ধংদেহী বাগাড়ম্বর কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে যেকোনো ধরনের অবিবেচনাপ্রসূত পদক্ষেপ বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে।

banner
Link copied!